নেসেটে মোদির ভাষণ: ইসরাইলের পাশে ভারতের অঙ্গীকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪২ বার
মোদির ইসরাইল সফর সমর্থন

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরাইল সফরের প্রথম দিনেই দেশটির পার্লামেন্ট নেসেট-এ ভাষণ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রতি ভারতের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এ ভাষণে তিনি বলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ভারতের নীতিগত অঙ্গীকার এবং সেই কারণেই ইসরাইল-এর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ভারত দৃঢ়ভাবে পাশে রয়েছে। নেসেটে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এটাই প্রথম ভাষণ, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভাষণের শুরুতেই মোদি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, হামাস-নেতৃত্বাধীন ওই হামলা ছিল ‘বর্বর’ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য বা আদর্শ কখনোই নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। মোদি বলেন, সন্ত্রাসবাদ শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলায় বিশ্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

মোদির সফরের শুরুতেই তেল আবিব বিমানবন্দরে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। স্বাগত ভাষণে নেতানিয়াহু ভারতকে ‘ভরসার প্রতীক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়, এটি পারস্পরিক আস্থা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক বিশেষ অংশীদারিত্ব। তিনি মোদিকে ‘বন্ধুর চেয়েও বেশি, একজন ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করেন এবং বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৌশলগত সহযোগিতাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

নেসেটে দেওয়া ভাষণে মোদি আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদিত গাজা শান্তি উদ্যোগকে সমর্থন করে এবং বিশ্বাস করে যে এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শান্তির পথ তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সংলাপ, উন্নয়ন ও আস্থার পরিবেশ—যেখানে সব পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তাঁর বক্তব্যে গাজা-এর মানবিক পরিস্থিতির কথাও উঠে আসে, যেখানে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা। মোদি তাঁর ভাষণে প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো উচ্চপ্রযুক্তি খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন। দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ইতিমধ্যে দ্রুত প্রসারিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত ইসরাইল থেকে প্রায় ২০.৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে, যা দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।

তবে মোদির এই সফর ভারতের অভ্যন্তরে একমুখী সমর্থন পায়নি। বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-এর নেতারা সফরটির সময় ও বার্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ভারতের ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতি সব সময় ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেওয়া উচিত নয়। তারা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য জরুরি।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফর শুধু প্রতীকী নয়; এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। ইসরাইলি দৈনিক হারেটজ-এর সাংবাদিক গিডন লেভি আল জাজিরা-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মোদির সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরাইল গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্রদের সমর্থন পাচ্ছে। তাঁর মতে, গাজায় মানবিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে জনমত সমালোচনামুখী হলেও রাষ্ট্রীয় কূটনীতির হিসাব আলাদা, যেখানে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বড় ভূমিকা রাখে।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ভারতের এই অবস্থান আংশিকভাবে তার বৈশ্বিক কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ভারত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমান্তরাল অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ, যেখানে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ভারত আরব দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে, যাতে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

মোদির সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি ইসরাইলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে প্রতিরক্ষা চুক্তি, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। সফর শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশের সম্ভাবনাও রয়েছে, যেখানে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরা হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও নতুন বার্তা দিচ্ছে। এটি দেখাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বা সংঘাতের পরিস্থিতি সত্ত্বেও কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলো তাদের জোট ও অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন করছে। ফলে মোদির নেসেট ভাষণকে অনেকে একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন—যেখানে ভারত নিজেকে বৈশ্বিক মঞ্চে আরও দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

এই সফর শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে ভারতের সক্রিয় কূটনৈতিক উপস্থিতি অঞ্চলটির শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশটির ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত