বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনায় মব-কালচার অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
বাংলাদেশ ব্যাংক মব কালচার বিতর্ক

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আর্থিক খাতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংক-এ সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির। তিনি দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সৃষ্ট পরিস্থিতি বর্তমান সরকারের সমর্থিত ‘মব-কালচারের’ আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন, যা দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও উপদেষ্টার মতো উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ নিয়ে। তার ভাষ্যমতে, সম্মানিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য, এবং এ ধরনের আচরণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তিনি তার বক্তব্যে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও টানেন। তার মতে, অর্থনীতি ইতোমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে গেছে। এর সঙ্গে যদি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা যুক্ত হয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তার পোস্টে তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে চাপ সৃষ্টি বা বিশৃঙ্খলা তৈরির খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তার ভাষায়, যদি এ ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রশাসনিক দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা দায়িত্ব নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

সরকারের প্রতি বার্তায় তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা ও দেশপ্রেমকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্ব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এমন মন্তব্য রাজনৈতিক চাপের প্রতিফলন হলেও এর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ওপর পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। তাই এ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও আর্থিক অংশীদারদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। তাদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য নিরূপণ করা জরুরি, যাতে কোনো ধরনের ভুল ধারণা সৃষ্টি না হয়।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এমন অভিযোগ সামনে এলে সাধারণত সরকার তদন্ত বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য প্রকাশের পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে দেখছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, তবে প্রতিটি ঘটনা জনআলোচনায় আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। তারা বলছেন, যেকোনো অভিযোগ বা সমালোচনার ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হলে জনমনে আস্থা বজায় থাকে এবং অযথা বিভ্রান্তি কমে যায়। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডা. শফিকুর রহমানের মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নাকি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ—তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিষয়টি যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনআস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত