প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেপালের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন এক নাটকীয় মোড় নিচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি সরকারের পতন ঘটে। সেই আন্দোলনে নিহত হন ৭৭ জন, এবং দেশের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের আবির্ভাবের এক সংকেত তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে র্যাপার থেকে রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত হওয়া ৩৫ বছর বয়সি বলেন্দ্র শাহ, যার ডাকনাম ‘বালেন’, আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন।
বালেন শাহ সামাজিক মাধ্যমে তার লাখো অনুসারীর উদ্দেশে পোস্ট দিয়েছেন, যেখানে তিনি লিখেছেন, “প্রিয় জেন-জি, আপনার খুনিদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। আপনাদের প্রজন্মকে এখন দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে, এজন্য প্রস্তুত হন।” তার এই বার্তা দেশজুড়ে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিশেষ সাড়া ফেলেছে। কাঠমান্ডুর রাস্তায় সাধারণ মানুষ বাসে লেখা স্টিকার এবং সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক অদ্ভুত ও প্রভাবশালী জনপ্রিয়তার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ বিপীন অধিকারী মনে করেন, বালেন শাহ এতই জনপ্রিয় যে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তার প্রতি সমর্থন কার্যত অভূতপূর্ব। অনেক বাসের গায়ে লেখা স্টিকার দেখানো হচ্ছে, যা এক ধরণের সামাজিক সমর্থন ও প্রচারণার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনীতির মঞ্চে বালেন শাহের যাত্রা অদ্ভুত নাটকীয়। তিনি র্যাপ গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন জয় করেছেন এবং সেই জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক মূলধারার সঙ্গে মেলাতে সক্ষম হয়েছেন। তার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় স্বাধীন পার্টি (আরএসপি) একটি নতুন মধ্যপন্থি দল হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনি ইশতেহারে বালেন শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বড় দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বালেন শাহের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো তার মেয়র হিসেবে কাঠমান্ডুর অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই উদ্যোগগুলো সাধারণ নাগরিকের জীবনমান উন্নত করেছে এবং তাকে ভোটারদের মধ্যে দৃঢ় সমর্থন দিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থা যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার সমালোচনা করেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ব্যবহার করে হকার এবং ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করার মতো কর্মকাণ্ডে তার মেয়র পদে থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিতে বালেন শাহ এ বছরের জানুয়ারিতে মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে তিনি সামাজিক মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে সমর্থন আদায় করেছেন। রয়টার্সের প্রচেষ্টা অনুযায়ী তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বালেন শাহের উদ্ভাবনী রাজনীতিক কৌশল, সামাজিক গণমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং শহরের ব্যবস্থাপনায় সফলতার সমন্বয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছে। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবনা মেলানো, যা নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন ধারা সূচনা করতে পারে।
বালেন শাহের সম্ভাব্য জয় কেবল একজন ব্যক্তির নাটকীয় উত্থান নয়; এটি নেপালের তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্বের উপস্থিতি ভবিষ্যতে নেপালের রাজনীতির চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে। তার নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বালেন শাহের এই রূপান্তর দর্শকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ তাকে শুধু একজন র্যাপার বা মেয়র হিসেবে নয়, বরং দেশের জন্য নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তরুণ ভোটাররা বিশেষভাবে তাকে সমর্থন করছেন, কারণ তার রাজনীতিতে প্রবেশ সামাজিক ন্যায্যতা, আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত।
নির্বাচনের আগে বালেন শাহের জনপ্রিয়তা ও বিতর্কময় কর্মকাণ্ড একসঙ্গে দেশজুড়ে রাজনীতির নতুন দিক নির্ধারণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বালেন শাহের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক কৌশল আগামী নির্বাচনে ফলাফলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে এবং নেপালের পরবর্তী সরকারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।