মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে আগুন, বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকা অসুস্থ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
জ্বলছে ঢাকা দক্ষিণের সবচেয়ে বড় ময়লার ভাগাড়

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে বড় ময়লার ভাগাড় মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের আগুন কয়েক দিন ধরে নিভছে না। বিশাল ময়লার স্তূপে একাধিক স্থানে লেগে থাকা আগুনের কারণে ঘন ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ পুরো পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে তাদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শ্বাসকষ্ট, কাশি, ঠান্ডা লাগা এবং গায়ে চর্মরোগের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, আগুন এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়; ল্যান্ডফিলের বিভিন্ন অংশে আগুন একযোগে লেগে আছে। বিশাল ময়লার পাহাড়ে ঘন ধোঁয়া বের হচ্ছে, যা ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন এবং রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে, তবে ল্যান্ডফিলের আকার ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ।

ঢাকায় প্রতিদিন দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ বর্জ্য সরাসরি ড্রেন, খাল ও জলাশয়ে মিশছে, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজেশন জরুরি।

মিশন গ্রিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, “মানুষ যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছে, কিন্তু কাউকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য সচেতনতা বা শিক্ষা নেই। ল্যান্ডফিলে ফেলা বর্জ্য পরিবেশকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ময়লাকে যদি ‘ওয়েলথ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা থেকে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। এজন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার জরুরি।”

স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ নেই এবং সারাদিনই ধোঁয়া ছড়িয়ে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জানিয়েছেন, আগুন নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি এবং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে ল্যান্ডফিলের বিশাল আকার ও বর্জ্যের স্তূপের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তুলছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করা হবে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, শুধুমাত্র প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, “সরাসরি বা অনিয়মিত বর্জ্য ফেলা রোধ করতে নাগরিকদের সহায়তা প্রয়োজন। জনগণ যদি সচেতন হয়, তবে বর্জ্য সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকা শহরের বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার নীতি গ্রহণের মাধ্যমে। বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আধুনিক ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শহরের পরিবেশ ও নাগরিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা যেতে পারে।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের আগুনের কারণে ধোঁয়া ও দুর্গন্ধের প্রকোপ স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। তারা বলছেন, দিনরাত ঘন ধোঁয়ার মধ্যে নিঃশ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুরা, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ বেশি ঝুঁকির মধ্যে। এছাড়া স্থানীয় ব্যবসা ও পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশের নগরায়ণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকা শহরের মতো বড় শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি নির্ভর সমাধান ছাড়া সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে। আধুনিক ল্যান্ডফিল, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ না থাকলে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।

এ পরিস্থিতি থেকে দেখা যাচ্ছে, শুধু অগ্নিনির্বাপনেই সীমাবদ্ধ থেকে গেলে ঢাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত দূষণ দূর করা সম্ভব হবে না। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের আগুন নিভানোর পাশাপাশি, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে স্থায়ী সমাধান গ্রহণ করা প্রয়োজন। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং এবং আধুনিক ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রয়োগে ঢাকা শহরের দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তা না হলে, শুধু ঢাকা নয়, পুরো শহরাঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত