প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বুধবার অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের মাধ্যমে বর্তমান সরকার আর্থিক খাতে লুটপাটের পথ উন্মুক্ত করেছে। তিনি বলেন, আহসান মনসুরের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গৃহীত সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ছিল এবং অর্থ পাচারের প্রক্রিয়াতেও দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটেছিল। কিন্তু গভর্নরকে অপসারণ করার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আহসান মনসুর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা স্থাপনে অনেকটাই সফল হন। ব্যাংকিং খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করে তিনি খাতটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হন। বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে দেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। এর পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে চলা অর্থ পাচারও তিনি বন্ধ করার উদ্যোগ নেন।
নাহিদ ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, আহসান মনসুর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন। এটি বাস্তবায়ন হলে সরকারদলীয় ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং খাতে হস্তক্ষেপ সীমিত হতে পারত। এসব সংস্কারের কারণে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর লুটপাটের পথ কিছুটা বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে গভর্নর আহসান মনসুরের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন কিছু রাজনৈতিক ও ব্যাংকিং কর্মকর্তারা।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দখল ও অস্থিতিশীলতার চেষ্টা শুরু করে বিএনপি-আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তারা। ব্যাংকের নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে তারা হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ধারাবাহিকতায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে গভর্নরের উপদেষ্টা রীতিমতো শারীরিক হেনস্তার শিকার হন। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, এ ধরনের হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন নওশাদ মোস্তফা, সারোয়ার, মাসুম বিল্লাহ, গোলাম মোস্তফা শ্রাবণসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিএনপিপন্থি আবার কেউ কেউ আওয়ামীপন্থি নীল দল থেকে নির্বাচিত হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্ব পালন করছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার সফল গভর্নর আহসান মনসুরকে সরিয়ে অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী কায়দায় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মোস্তাকুর রহমান একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ী, যিনি সাবেক ঋণখেলাপি। তিনি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণখেলাপি ছিলেন এবং বিশেষ বিবেচনায় ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতপশিল পেয়েছেন। নাহিদ ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এমন একজন ব্যবসায়ীকে দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক এবং আর্থিক খাতের দায়িত্বে আনা হয়েছে, যা আর্থিক সেক্টরে লুটপাট ও অনিয়মের পথ সুগম করতে পারে।
তিনি বলেন, আহসান মনসুরের মতো অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদকে সরিয়ে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বিদেশে অর্থ পাচারের পথ পুনরায় সুগম করা হয়েছে। সরকারের অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপের ফলে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ছে। নাহিদ ইসলাম সরকারকে সতর্ক করে বলেন, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদের হাতে দিতে হবে, যাতে আর্থিক খাত নিরাপদ ও স্বচ্ছ থাকে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও আর্থিক খাতের সুষ্ঠু পরিচালনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এনসিপি’র পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়েছে এবং সরকারের আর্থিক নীতির স্বচ্ছতা ও সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদকে সরিয়ে বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে দায়িত্বে আনা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।