প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী মিলনায়তন বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে পরিণত হয় এক গর্বিত ও আবেগঘন আয়োজনে। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর একটি ‘একুশে পদক ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প-সাহিত্যচর্চাকে রাজনীতিকীকরণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা কোনোভাবেই সভ্য সমাজের পরিচায়ক হতে পারে না; বরং একটি উদার, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার স্বাধীন বিকাশ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী একুশে পদকের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল একটি পুরস্কার নয়; বরং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাসকে স্মরণে রাখার এক রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম—সবকিছুর ধারাবাহিকতায় একুশে পদক আজ এক অনন্য সম্মাননায় পরিণত হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৬ সালে তিনটি ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে এ সম্মাননার যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্তত ১২টি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রের এই বিস্তৃত স্বীকৃতি প্রক্রিয়াকে তিনি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখা গুণীজনদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা।
শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প-সাহিত্যচর্চার স্বাধীনতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রকে যদি রাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাবমুক্ত রাখা না যায়, তবে সমাজের সামগ্রিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন হবে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র, যেখানে মতের বৈচিত্র্য থাকবে, কিন্তু তা হবে সভ্য ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে। রাষ্ট্র ও সরকার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
ফেব্রুয়ারি মাসের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মাস আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক। একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল ভাষার অধিকারের সংগ্রাম নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনার প্রতীক। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয়, আমাদের সংস্কৃতিচেতনার প্রাণপ্রবাহকে জাগ্রত করে। ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি তার আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
এবার ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর অতিক্রম করে ৭৫ বছরে পদার্পণের প্রেক্ষাপটে আয়োজিত একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রধানমন্ত্রী গভীর শ্রদ্ধাভরে ভাষা সংগ্রামীদের স্মরণ করেন এবং তাঁদের আত্মত্যাগকে জাতির চিরন্তন প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন তাঁদের শহীদি মৃত্যু কবুল করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য নির্বাচিত গুণীজনদের হাতে একুশে পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। চলচ্চিত্রে সম্মাননা পেয়েছেন বরেণ্য অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। চারুকলায় অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার এবং স্থাপত্যে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম সম্মানিত হয়েছেন তাঁদের সৃজনশীল অবদানের জন্য।
সংগীতে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়েছে কিংবদন্তি ব্যান্ডশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু-কে, যিনি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড ওয়ারফেজ-কেও সংগীত দল হিসেবে এ বছর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে, যা দেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ সম্মাননা লাভ করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের দীর্ঘ কর্মময় জীবন ও সৃজনশীল অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, গুণীজনদের কর্মজীবন ও অবদান সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল একটি পদক প্রদান নয়; এটি একটি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, যা সমাজকে জানায়—জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি প্রত্যাশা করেন, একুশে পদকপ্রাপ্তরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে জাতিকে আরও সমৃদ্ধ করবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি, সংস্কৃতিকর্মী ও শিক্ষাবিদদের উপস্থিতি আয়োজনকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে। মিলনায়তনের ভেতরে ছিল একদিকে আবেগ, অন্যদিকে গর্বের আবহ। পুরস্কারপ্রাপ্তদের পরিবারের সদস্যদের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, যা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গভীর মানবিক তাৎপর্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্তদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, তাঁদের সৃজনমুখর জীবন দীর্ঘ হোক এবং কল্যাণময় হোক—এই প্রার্থনা তিনি মহান আল্লাহর দরবারে করেন। একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একদিন বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় আরও উজ্জ্বলভাবে আলো ছড়াবে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননাগুলোর একটি হিসেবে একুশে পদক বরাবরই জাতীয় গর্বের প্রতীক। এবারের আয়োজনেও সেই ঐতিহ্য ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থেকেছে। শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা ও গবেষণাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে মুক্ত ও মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটানোর যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।