প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় শরীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করে পানি ও শক্তির। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীর কিছুটা পানিশূন্য হয়ে পড়ে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও কমে যায়। তাই ইফতারের শুরুতেই এমন কিছু পানীয় গ্রহণ করা জরুরি, যা শরীরকে দ্রুত সতেজ করে, পানির ঘাটতি পূরণ করে এবং হজমে সহায়তা করে। এই সময় অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে ডাবের পানি কিংবা আখের রস। দুটিই প্রাকৃতিক পানীয়, দুটিই পুষ্টিগুণে ভরপুর, তবে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে কোনটি বেশি উপকারী—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই আলোচনা দেখা যায়।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডাবের পানি এবং আখের রস—উভয়েরই আলাদা পুষ্টিগুণ রয়েছে এবং শরীরের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পূরণে এগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে। আখের রসকে অনেকেই তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। এতে প্রাকৃতিক চিনি, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরকে দ্রুত শক্তি জোগাতে সহায়তা করে। সারাদিন রোজা রাখার পর শরীর যখন ক্লান্ত থাকে, তখন এক গ্লাস আখের রস পান করলে তা দ্রুত শক্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। এছাড়া এটি শরীর ঠান্ডা রাখতে সহায়ক এবং গরম আবহাওয়ায় ক্লান্তি দূর করতেও সাহায্য করে বলে পুষ্টিবিদরা মনে করেন।
আখের রসে থাকা কিছু উপাদান লিভারের কার্যকারিতা ভালো রাখতে সহায়তা করে বলেও গবেষণায় দেখা গেছে। অনেকের মতে, এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে সহায়ক হতে পারে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে। তবে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা হলো, আখের রসে প্রাকৃতিক চিনি তুলনামূলক বেশি থাকে, যা অতিরিক্ত পরিমাণে পান করলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ডাবের পানি স্বাভাবিকভাবেই কম ক্যালরিযুক্ত এবং এতে প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইট যেমন পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে শরীরে যে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, ডাবের পানি তা দ্রুত পূরণ করতে পারে। অনেক চিকিৎসক ইফতারের শুরুতে ভারী খাবারের পরিবর্তে ডাবের পানি পান করার পরামর্শ দেন, কারণ এটি হালকা, সহজপাচ্য এবং পেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না।
হজমের সমস্যার ক্ষেত্রেও ডাবের পানি তুলনামূলকভাবে বেশি উপকারী বলে মনে করা হয়। রোজা শেষে অনেকেই হঠাৎ করে বেশি খাবার খেলে পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভোগেন। ডাবের পানি পাকস্থলীতে প্রশান্তি এনে হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির প্রবণতা আছে, তাদের জন্য ইফতারের শুরুতে ডাবের পানি একটি নিরাপদ ও আরামদায়ক বিকল্প।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ডাবের পানির ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ইতিবাচক তথ্য পাওয়া গেছে। এতে থাকা পটাশিয়াম হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। গরম আবহাওয়ায় শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে ডাবের পানি তা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা সারাদিন রোদে কাজ করেন বা প্রচণ্ড গরমে রোজা রাখেন, তাদের জন্য ডাবের পানি অত্যন্ত উপকারী পানীয় হতে পারে।
তবে আখের রসের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার। রাস্তার পাশে বিক্রি হওয়া আখের রস সব সময় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে প্রস্তুত হয় না। অপরিষ্কার যন্ত্র বা পানির কারণে এতে জীবাণু থাকার ঝুঁকি থাকে, যা পেটের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই আখের রস পান করতে হলে পরিষ্কার ও নিরাপদ উৎস থেকে নেওয়া জরুরি। একইভাবে ডাবের পানিও যেন তাজা হয় এবং কাটার সময় পরিষ্কার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পুষ্টিবিদরা মনে করেন, কোন পানীয় বেশি উপকারী তা নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, প্রয়োজন এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর। যদি কারও শরীর খুব দুর্বল লাগে এবং দ্রুত শক্তির প্রয়োজন হয়, তাহলে পরিমিত পরিমাণ আখের রস উপকারী হতে পারে। আবার যদি লক্ষ্য থাকে শরীরকে হাইড্রেট রাখা এবং হজমকে স্বাভাবিক রাখা, তাহলে ডাবের পানি বেশি কার্যকর বিকল্প। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সাধারণত ডাবের পানি নিরাপদ ধরা হয়, কারণ এতে প্রাকৃতিক চিনি কম থাকে এবং গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ইফতারের পানীয় নির্বাচন করার সময় শুধু স্বাদ নয়, স্বাস্থ্যগত দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। অনেক সময় মানুষ তৃষ্ণা মেটাতে অতিরিক্ত মিষ্টি বা ঠান্ডা পানীয় পান করেন, যা সাময়িক আরাম দিলেও পরে শরীরে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই ইফতারের শুরুতে এমন পানীয় গ্রহণ করা উচিত, যা শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে এবং হজমে সহায়তা করে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ডাবের পানি এবং আখের রস—দুটিই প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর পানীয়, তবে তাদের কার্যকারিতা ভিন্ন। আখের রস শক্তি জোগাতে দ্রুত কার্যকর হলেও অতিরিক্ত চিনি থাকার কারণে সীমিত পরিমাণে পান করা উচিত। অন্যদিকে ডাবের পানি হালকা, সহজপাচ্য এবং শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করতে সক্ষম, যা ইফতারের শুরুতে বিশেষভাবে উপকারী। তাই স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো নিজের শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী পানীয় নির্বাচন করা এবং সব ক্ষেত্রে পরিমিতি বজায় রাখা।
রমজানে সুস্থ থাকতে চিকিৎসকরা সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রাকৃতিক পানীয় গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ইফতারের টেবিলে ডাবের পানি বা আখের রস যেটিই থাকুক না কেন, সচেতনভাবে ও পরিমিতভাবে পান করলেই সেটি শরীরের জন্য উপকারী হয়ে উঠতে পারে।