যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামানের সম্পদ জব্দের নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৪ বার
Saifuzzaman Chowdhury

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী–এর যুক্তরাজ্যে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ আদালত এই আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট মহলে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ বিদেশে সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচার সংক্রান্ত অভিযোগে কোনো সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ বিরল এবং তা তদন্ত প্রক্রিয়ার গুরুত্বও নির্দেশ করে।

আদালত সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক একটি বিশদ আবেদন দাখিল করে জানায় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার সংশ্লিষ্টদের নামে যুক্তরাজ্য–এর বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর উৎস নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এই আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত–এর বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

দুদকের আবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তের নামে বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তিপত্র, ডিড, পেমেন্ট অর্ডার, বুকিং মানির রসিদ, চেক ও ভাউচারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছে। এসব নথি যাচাই করে দেখা দরকার সম্পত্তিগুলো বৈধ আয়ে কেনা হয়েছে কি না। তদন্তকারীরা আদালতকে জানান, যদি সম্পদের উৎস অবৈধ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই তদন্তের স্বার্থেই প্রাথমিকভাবে এসব সম্পদ জব্দ করা জরুরি।

দুদকের উপস্থাপিত প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়, লন্ডন–এর অভিজাত আবাসিক এলাকা মেরিলিবোন স্কয়ার–এ প্রায় ৬৫ লাখ ২১ হাজার পাউন্ড মূল্যের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া একই শহরের ওভাল ভিলেজ–এ একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকানার তথ্যও তদন্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, ক্ল্যারেনডন রোড এলাকায় প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড মূল্যের একটি সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে, যা তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

শুধু রাজধানী শহরেই নয়, ইংল্যান্ডের অন্যান্য এলাকাতেও সম্পত্তি থাকার তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তদন্ত নথি অনুযায়ী, লিভারপুল–এর ওয়ান ইসলিংটন প্লাজা নামের আবাসিক ভবনে একাধিক ইউনিট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হারো, স্লফ এবং প্রেস্টন এলাকাতেও সম্পত্তির সন্ধান পাওয়ার কথা আদালতকে জানানো হয়েছে। এসব তথ্য প্রাথমিক পর্যায়ের এবং তদন্ত শেষে প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা যায়।

দুদকের আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করছে। এতে সিআইডি এবং এনবিআর–এর সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে আর্থিক লেনদেন, কর নথি ও আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ বিশ্লেষণ করা যায়। তদন্তকারীদের মতে, বিদেশে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে প্রায়ই জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়, যা শনাক্ত করতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই নির্দেশ তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। কারণ বিদেশে সম্পদ থাকলে অভিযুক্তরা তা বিক্রি বা স্থানান্তর করার চেষ্টা করতে পারেন, যা ভবিষ্যতে মামলার প্রমাণ সংগ্রহকে কঠিন করে তুলতে পারে। সম্পদ জব্দ থাকলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে এবং প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, বিদেশি আদালতের অনুরোধে সেখানকার কর্তৃপক্ষ সম্পদ জব্দ বা নজরদারির ব্যবস্থা নিতে পারে, যদি প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও জানা গেছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে সম্পদ নিয়ে অভিযোগের ঘটনা বাড়ায় সরকার ও তদন্ত সংস্থাগুলো বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর অংশ হিসেবেই এমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এটি একটি বার্তাও দেয় যে, অবৈধ অর্থ বিদেশে সরিয়ে রাখলেও তা আইনের আওতার বাইরে নয়।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে আইন অনুযায়ী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। আদালত পরবর্তী শুনানিতে তদন্ত অগ্রগতির প্রতিবেদন চাইতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে সম্পদগুলোর প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা।

এই ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, আবার অন্যরা মনে করছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করা ঠিক নয়। তবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাষ্ট্রের অর্থ পাচার হয়ে বিদেশে সম্পদ গঠনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই মামলার অগ্রগতি ভবিষ্যতে বিদেশে অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ ফেরত আনার পথও খুলে যেতে পারে। অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকার ফিরে পাবেন।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ এখন দেশের অন্যতম আলোচিত আইনি ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে অভিযোগের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত