প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী–কে পৃথক পাঁচটি মামলায় জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার এবং বিচারপতি শেখ আবু তাহের–এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তে আইন অঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, একাধিক মামলা এবং পূর্ববর্তী স্থগিতাদেশের পর এই জামিন আদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদালত সূত্র জানায়, যে পাঁচটি মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে চারটি হত্যা মামলা এবং একটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলা। হত্যা মামলাগুলো হয়েছে ফতুল্লা থানা এলাকায়, যেখানে বাসচালক আবুল হোসেন মিজি, আব্দুর রহমান, মো. ইয়াছিন ও পারভেজ হত্যার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অন্য মামলাটি হয়েছে সদর মডেল থানা এলাকায়, যেখানে হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন এবং আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু। তারা আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন যে, তাদের মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। তারা বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে আইভীর সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে এবং তদন্ত চলমান থাকলেও তাকে অযথা আটক রাখা উচিত নয়। আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শুনে জামিনের আদেশ দেন।
আইনি নথি অনুযায়ী, গত বছরের ৯ মে ভোর রাত তিনটার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত তার বাসভবন চুনকা কুটির থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। প্রথমদিকে নিম্ন আদালত থেকে জামিন না পাওয়ায় বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ায়। হাইকোর্ট একপর্যায়ে পাঁচ মামলায় জামিন দিলেও পরে আপিল বিভাগের আদেশে সেই জামিন স্থগিত হয়ে যায়। এর মধ্যেই ১৮ নভেম্বর তাকে আরও পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যা মামলাগুলোর জটিলতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
আইভী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন–এর নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবন নানা উত্থান-পতন, বিরোধ ও আলোচনায় ভরা। সমর্থকদের কাছে তিনি দৃঢ়চেতা ও আপসহীন নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও সমালোচকদের মতে তার কর্মকাণ্ড বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি লড়াই নতুন কোনো ঘটনা নয়, বরং তার রাজনৈতিক যাত্রাপথেরই অংশ।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একাধিক গুরুতর অভিযোগের মামলায় জামিন পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি হলেও এটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। জামিন মানে অভিযুক্তের নির্দোষ প্রমাণ নয়; বরং বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া। আদালত প্রয়োজনে শর্ত আরোপ করতে পারে এবং তদন্তে সহযোগিতা না করলে বা শর্ত ভঙ্গ করলে জামিন বাতিলও হতে পারে।
এই মামলাগুলোর তদন্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো বলছে, ঘটনাগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটনে তারা সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের দাবি, মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইভীকে হয়রানির জন্যই একাধিক মামলা করা হয়েছে। আদালতে এসব যুক্তিতর্কই দীর্ঘ শুনানির মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তা শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলে। আইভীর ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। তার গ্রেপ্তার, জামিন, স্থগিতাদেশ এবং পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনাগুলো জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা কঠিন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আইভীর পরিবারের সদস্যরা আগেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তারা আদালতের প্রতি আস্থা রাখেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। জামিনের খবর প্রকাশের পর তার সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও বিরোধী পক্ষ বলছে, মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। এদিকে সাধারণ নাগরিকদের অনেকেই মনে করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনবিদদের মতে, একাধিক মামলার আসামি হলে জামিন পাওয়া প্রক্রিয়াগতভাবে জটিল হয়, কারণ প্রতিটি মামলার আলাদা আলাদা অভিযোগ, সাক্ষ্য ও প্রমাণ থাকে। আদালতকে প্রতিটি মামলার নথি পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হয়। এই ক্ষেত্রে হাইকোর্টের আদেশ থেকে বোঝা যায় যে বিচারপতিরা মামলার উপস্থাপিত তথ্য ও যুক্তি বিশ্লেষণ করে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বর্তমানে নজর রয়েছে মামলাগুলোর পরবর্তী শুনানি ও তদন্ত অগ্রগতির দিকে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে মামলাগুলোর গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত সম্পূর্ণ মুক্তি পাবেন।
সব মিলিয়ে এই জামিন আদেশ শুধু একজন সাবেক মেয়রের ব্যক্তিগত আইনি সাফল্য নয়, বরং দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। আইভীর মামলাগুলোর পরবর্তী ধাপ এখন জনমনে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে, কারণ এর ফলাফল স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার জন্ম দিতে পারে।