প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ করেই কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে অনুভূত এই ভূকম্পন কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভবন থেকে দ্রুত নেমে খোলা স্থানে আশ্রয় নেন, আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে থাকেন। ভূমিকম্পের তীব্রতা তুলনামূলক মাঝারি হলেও রাজধানীসহ আশপাশের জেলা ও উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় কম্পন অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
ভূকম্পনের উৎস সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য জানায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিম এলাকায় ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছে। রাজধানী থেকে প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ওই অঞ্চলে উৎপন্ন কম্পন বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুভূত হওয়া ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বাভাবিক নয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের ভূত্বক অত্যন্ত সক্রিয় হওয়ায় সেখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে অনুভূত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ৮। একই তথ্য নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র। সংস্থাটি জানায়, এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শ্রেণিভুক্ত এবং সাধারণত এ ধরনের কম্পনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে, বিশেষত যদি কেন্দ্রস্থল দূরে থাকে।
কম্পন অনুভূত হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনে কর্মরত মানুষ কিছু সময়ের জন্য আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই জানান, তারা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও হালকা দুলুনি টের পেয়ে দ্রুত বাইরে চলে যান। পুরান ঢাকা, মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানকারী বাসিন্দারা জানান, জানালা ও ফ্যান দুলতে দেখে তারা ভূমিকম্পের বিষয়টি নিশ্চিত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, কয়েক সেকেন্ডের কম্পন হলেও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় মাঝেমধ্যে এমন কম্পন অনুভূত হওয়া স্বাভাবিক। দেশটি সরাসরি বড় ফল্ট লাইনের ওপর না থাকলেও ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ অঞ্চলের নিকটে অবস্থান করার কারণে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূমিকম্পের প্রভাব এখানে পৌঁছাতে পারে। ভূমিকম্পের মাত্রা ৫ এর নিচে থাকলে সাধারণত বড় ক্ষতি হয় না, তবে ভবন দুর্বল হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোতে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখলেও এখন পর্যন্ত জরুরি উদ্ধার তৎপরতার প্রয়োজন পড়েনি। তবে তারা নাগরিকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলেছে।
ভূমিকম্পের পরপরই অনেকে অতীতের বড় ভূমিকম্পগুলোর কথা স্মরণ করেন, বিশেষ করে যেগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষকরা বলেন, ইতিহাসে দেখা গেছে হিমালয় অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের নজির রয়েছে। যদিও আজকের কম্পন তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার, তবুও এটি ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক চাপের একটি ইঙ্গিত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শহুরে অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বরাবরই সতর্ক করে আসছেন। তাদের মতে, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবন নির্মাণে সঠিক নকশা ও মান বজায় রাখা। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন ও পুরোনো ভবনের ঝুঁকি থাকলে মাঝারি মাত্রার কম্পনও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই নগর পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত পরিদর্শন জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক প্রাকৃতিক ঘটনার সময় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যারা উচ্চ ভবনে থাকেন বা আগে ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তারা বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, তাই সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর তারা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করছে এবং কোনো আফটারশকের সম্ভাবনা আছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করছে। সাধারণত মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর ছোটখাটো পরাঘাত হতে পারে, যদিও সেগুলো খুব কমই অনুভূত হয়। তবুও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রস্তুতি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করে থাকে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরের এই ভূকম্পন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না ঘটালেও নাগরিকদের মনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে নতুন করে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ছোট ভূমিকম্প ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে প্রস্তুতি নেওয়ার একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও প্রস্তুতিই হতে পারে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।