পৌরসভায় রাজনৈতিক প্রশাসক পরিকল্পনা নেই: ফখরুল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
পৌরসভায় প্রশাসক নিয়ে বক্তব্য

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পৌরসভাগুলোতে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা এবং নাগরিক সেবা স্বাভাবিক রাখতে সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তবে পৌরসভায় রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তা বাস্তবসম্মত নয়। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড Facebook পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অবস্থান স্পষ্ট করেন।

দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পদ্ধতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়–এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এই মন্ত্রী বলেন, পৌরসভাগুলোতে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও আইনগত কাঠামো বজায় রাখাই সরকারের অগ্রাধিকার। তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে আদালতের নির্দেশে কেবল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন–এ একজন নির্বাচিত মেয়র দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন–সহ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ বাস্তব পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখছেন, আবার অন্যরা এটিকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচনা করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে পরিষ্কার করে বলেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা দুটি আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো এবং একটির সিদ্ধান্ত অন্যটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তার মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও সেটি স্থায়ী ব্যবস্থা নয় এবং তা কেবল প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যই করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের সেবা ব্যাহত না হওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য পূরণে আইনগত সীমারেখার মধ্যেই সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অপসারণ করা হয় বা তারা দায়িত্বে থাকতে পারেননি। অনেক জনপ্রতিনিধি নিরাপত্তাজনিত কারণে আত্মগোপনে যান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এর ফলে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয় এবং নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতিতে অস্থায়ী সমাধান হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি ছিল জরুরি ব্যবস্থা, যাতে নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অস্থায়ী ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় নাগরিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কাঠামো কতদিন চলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশাসক নিয়োগ ব্যবস্থা স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিকল্প হতে পারে না। তারা মনে করেন, দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়াই টেকসই সমাধান।

অন্যদিকে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের যুক্তি হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনি জটিলতার মধ্যে নির্বাচন আয়োজন সবসময় সম্ভব হয় না। তারা বলছেন, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কখনো কখনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। তবে এ ব্যবস্থাকে স্থায়ী করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেই সরকার বারবার জানিয়ে আসছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক নিয়োগের প্রশ্নে অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আলোচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নগর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো মূলত স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। তারা মনে করেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো যেন স্বচ্ছ ও জনস্বার্থভিত্তিক হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত নির্বাচন হলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং নাগরিক সেবা আরও কার্যকর হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালনা করাও বাস্তবসম্মত, যদি তারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

সব মিলিয়ে পৌরসভায় রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা নেই—এ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার মূলত চলমান বিতর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকলেও স্থানীয় সরকার কাঠামোর স্থায়ী রূপ নিয়ে সরকার এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পদ্ধতি নির্ধারিত হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত