প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে বইপ্রেমীদের জন্য বর্ণিল সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ সাজিয়ে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া তিনটায় তিনি মেলার উদ্বোধন করেন। তিন দফা তারিখ পরিবর্তন এবং প্রকাশকদের বিভিন্ন দাবি কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এবং আলোচনা–সমালোচনার পরেও শেষ পর্যন্ত মেলার রঙিন পরিবেশে বইপ্রেমীরা স্বাগতম জানাতে শুরু করেছেন। এবারের মেলা শুধু বইপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মর্যাদাও বহন করছে।
রমজান মাসে বইমেলা হওয়ায় নিরাপত্তা এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। মেলার প্রাঙ্গণ এবং আশেপাশের এলাকা কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) সরওয়ার জানান, মেলার সব কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা পুলিশি নজরদারিতে থাকবে। প্রাঙ্গণে স্থাপিত কন্ট্রোল রুম থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি নিরাপত্তা তদারকি করবেন। কোনো পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা বা জনবিরোধী কার্যক্রম এড়াতে পুলিশ বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে।
রমজান মাসে বইমেলা হওয়ায় প্রকাশক এবং প্রকাশনাসংস্থাগুলোতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রফিকুল ইসলাম, রুহামা পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী, বলেছেন, এবারের মেলা পবিত্র মাহে রমজানে হওয়ায় এটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও জ্ঞানচর্চার মাস, এবং তিনি বিশ্বাস করেন, যে কোনো বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন নিজেই এক পবিত্র সম্পদ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বইপ্রেমীরা এ মাসের মর্যাদা রক্ষা করে জ্ঞান অন্বেষণ ও চর্চায় আরও মনোযোগী হবেন।
অপরদিকে প্রগতি পাবলিকেশনের প্রকাশক আশরার মাসুদ মনে করেন, রমজান মাসে বইমেলা হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে মেলার বিক্রি তেমন জমে উঠবে না এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকাশকদের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, সাংস্কৃতিক আনন্দ এবং ব্যবসায়িক বাস্তবতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
ডিএমপি মেলা প্রাঙ্গণ ও আশেপাশের এলাকা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখার জন্য কঠোর নজরদারি করবে। এছাড়াও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আয়োজক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
মেলার চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকবে। ভারী যানবাহন টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারবে না। নির্ধারিত পার্কিং এলাকায় ফুলার রোড, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ এবং কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার সংলগ্ন স্থান ব্যবহার করা যাবে। নো-পার্কিং জোনে কোনো যানবাহন রাখলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিএমপি নির্দিষ্ট ইউটার্ন ও ডাইভারশন রুট নির্ধারণ করেছে যাতে দর্শনার্থী এবং যানবাহনের চাপ সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইউনিফর্মধারী পুলিশ, সাদা পোশাকধারী বিশেষ টিম, ফুট প্যাট্রোল ও মুক্তমঞ্চকেন্দ্রিক বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ডিবি, সিটিটিসি, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং সোয়াটসহ বিশেষায়িত ইউনিট প্রস্তুত থাকবে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যে মেলা শান্তিপূর্ণ এবং দর্শনার্থীরা বিনা ঝুঁকিতে বই উপভোগ করতে পারবেন।
বইমেলা শুধু বই বিক্রি বা সাহিত্যিক সমাবেশ নয়, এটি শিক্ষার, সংস্কৃতির এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের এক মিলনক্ষেত্র। বিশেষ করে রমজান মাসে হওয়ায় এখানে উপস্থিত পাঠকরা পবিত্র মাসের মর্যাদা বজায় রেখে জ্ঞানচর্চায় মনোযোগী হতে পারবেন। প্রকাশকরা বলছেন, এমন একটি পবিত্র পরিবেশে বইমেলার আয়োজন পাঠক-প্রকাশক উভয়ের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দর্শক ও প্রকাশকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি বলেন, বই মানুষের জ্ঞানের উৎস, এবং এই ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন দেশের জ্ঞানচর্চার ধারাকে শক্তিশালী করে। তার বক্তব্যে তিনি সকলকে উৎসাহিত করেন, বই পড়ার অভ্যাস বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির জন্য।
সবমিলিয়ে এবারের অমর একুশে বইমেলা পাঠক এবং প্রকাশকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক আয়োজন। পবিত্র মাহে রমজানকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও পরিবেশের পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত হওয়ায় বইপ্রেমীরা শান্তিপূর্ণভাবে জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করতে পারবেন।