প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থিত অস্থায়ী আদালতে বৃহস্পতিবার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও বিস্ফোরক আইনের মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। এই মামলায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হয়েছিলেন। আজকের দিনে সিআইডির ইন্সপেক্টর আবু বক্কর সিদ্দিক জবানবন্দি প্রদান করেন। এরপর আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তাঁকে জেরা করেন। আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. মমিনুল ইসলাম আগামী ২ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেছেন।
মামলার চিফ পাবলিক প্রসিকিউটর মো. বোরহান উদ্দিন জানান, মামলায় মোট ১৩৪৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলায় মোট ৮২২ জন আসামি রয়েছে। এর মধ্যে ৩২৮ জন জামিনে, কারাগারে আছেন ৪২৭ জন এবং পলাতক রয়েছে প্রায় ২০ জন। এছাড়াও ৬০ জন আসামি মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে ১৪৯ জনের জামিন আবেদন এখনও শুনানির অপেক্ষায় আছে।
আদালতে সাক্ষী আবু বক্কর সিদ্দিকের জবানবন্দিতে উল্লেখ থাকে, তিনি পিলখানার অস্ত্রাগারের গোডাউনের পাশে বিস্ফোরক দ্রব্য আলামত জব্দ করেছিলেন। সাক্ষীর প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলার কার্যক্রম আরও সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করার মাধ্যমে মামলার পক্ষপাতিত্বমূলক তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করেছেন।
পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনা ঘটেছিল ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন বিডিআর বিদ্রোহে একরাশ রক্তক্ষয় সংঘটিত হয়, যেখানে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা এবং ১৭ জন সাধারণ কর্মকর্তা সহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। প্রথমে চকবাজার থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে মামলাগুলো স্থানান্তরিত হয়ে নিউমার্কেট থানায় যায়। ২০১০ সালের জুলাই মাসে সিআইডি হত্যার মামলায় চার্জশিট দাখিল করে। হত্যার মামলার চার্জগঠন হয় ২০১১ সালের আগস্টে।
হত্যার মামলায় বিচার প্রক্রিয়া ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর নিম্ন আদালতে সম্পন্ন হয় এবং ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের আপিল নিষ্পত্তি হয়। তবে পিলখানায় বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে মামলার গুরুত্ব এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণের মান আদালত ও প্রসিকিউটর উভয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিচারের জটিলতা এবং দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়ার মধ্যে, সাক্ষীদের জবানবন্দি আইনগত প্রমাণ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিআইডি অফিসার আবু বক্কর সিদ্দিকের সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ তিনি ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরক আলামত উদ্ধার করেছিলেন। এই আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হলে মামলা আরও সুসংগঠিত ও প্রমাণভিত্তিক হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিলখানা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত হিসেবে থেকে গেছে। এ ধরনের মামলা দেশের বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা ও কার্যকারিতা যাচাই করার ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরেও সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আদালত প্রমাণভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রদানে অগ্রসর হচ্ছে।
মামলার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এই মামলার ধারাবাহিকতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দৃঢ় হচ্ছে। হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিচারের জন্য প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী গ্রহণ এবং জেরা প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হলেও এটি দেশের আইনি নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজনীয়।
সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালতের ধার্য অনুযায়ী পরবর্তী দিন, ২ এপ্রিল, আরও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে মামলার প্রমাণভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং আসামিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। বিচার প্রক্রিয়ার এই অংশ নাগরিক সমাজ, আইনপ্রণেতা এবং বিচার বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলার দীর্ঘায়িত বিচার প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে আদালত ও সিআইডির কর্মকর্তাদের কৌশলগত প্রস্তুতি এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পিলখানা ট্র্যাজেডি জাতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা হত্যার ঘটনা, অস্ত্রাগারের বিস্ফোরক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে উদাহরণ স্থাপন করেছে।
সব মিলিয়ে, পিলখানা বিস্ফোরক আইনের মামলায় ৩০৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হওয়া বিচার প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। আসন্ন সাক্ষ্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে মামলার সমাধান পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছাবে। এই দীর্ঘতম মামলার বিচার প্রক্রিয়া দেশের আইন এবং ন্যায়বিচারের দৃঢ়তা প্রদর্শন করে।