প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থল অঞ্চলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আফগানিস্তান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ অভিযোগ করেছেন, শুক্রবার ভোরে রাজধানী কাবুলে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। তার দাবি, আফগান বাহিনী সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে অভিযান চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই হামলা ঘটে। ঘটনাটি ঘিরে দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
আফগান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীতে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু কোথায় ছিল বা এতে হতাহতের সংখ্যা কত—তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। মুজাহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু কাবুলই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাকতিয়া প্রদেশেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে। যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযোগ স্বীকার করেনি।
ঘটনার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আফগানিস্তান আগে অভিযোগ করেছিল যে রোববার সীমান্ত অঞ্চলে পাকিস্তান প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালায়। সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আফগান বাহিনী পাল্টা অভিযান চালায় এবং সীমান্তের ওপারে এক ডজনের বেশি পাকিস্তানি সেনা চৌকি দখলের দাবি করে। তবে ইসলামাবাদ এ দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তাদের আগের অভিযান ছিল সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত একটি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।
পাকিস্তানের সরকারি সূত্রগুলো বলছে, আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক হামলা ছিল উসকানিমূলক। দেশটির নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলের নানগারহার প্রদেশে একটি বড় অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনার পর পাকিস্তানি বাহিনী “অপারেশন গজব-লিল-হক” নামে পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। এক কর্মকর্তা জানান, এ অভিযানে আফগান তালেবান সরকারের ১৩৩ জন সদস্য নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যম জিও নিউজ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই দাবি করা হয়েছে, যদিও এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সামরিক পদক্ষেপ আত্মরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পরিচালিত। দেশটির কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, আফগান সীমান্ত থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়মিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে, যা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অপরদিকে আফগানিস্তানের দাবি, পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি ও বিমান হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তেজিত করছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় দেশকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক জানান, মতপার্থক্য সমাধানে সামরিক নয়, কূটনৈতিক পথই হওয়া উচিত প্রধান উপায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে শুধু সীমান্ত সংঘর্ষ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব কাজ করছে। আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে অস্থির এবং সেখানে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি বহু বছর ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উভয় দেশই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিতে গিয়ে পারস্পরিক সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
কূটনৈতিক সূত্রের মতে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার আগে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল, সেটি এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর না থাকলে সীমান্তে ছোট সংঘর্ষও বড় সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাইছে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত হোক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয়ই ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে অবস্থিত এবং তাদের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্যপথ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিস্ফোরণের শব্দ, বিমান চলাচল ও সামরিক উপস্থিতি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান সংকটের সমাধান নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। যদি উভয় পক্ষ দ্রুত সংলাপে বসতে রাজি হয়, তাহলে উত্তেজনা কমানো সম্ভব। কিন্তু পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে কাবুলে হামলার অভিযোগ ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক আহ্বান এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখন বিশ্বজুড়ে নজর রয়েছে ইসলামাবাদ ও কাবুলের সিদ্ধান্তের দিকে, কারণ তাদের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই সংকট সাময়িক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বড় সংঘাতে রূপ নেবে।