প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের শিক্ষাঙ্গনজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল এক বিকেলের অগ্নিকাণ্ডে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছাত্রী হলসংলগ্ন একটি টিলায় আগুন লাগার ঘটনায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে প্রায় বিস্তীর্ণ এলাকা পুড়ে যায় এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ছয়জন নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারী আহত হন। গুরুতর আহত দুজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যাদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার বিকেল প্রায় আড়াইটার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রথমে টিলার শুকনো ঘাস ও পাতার স্তূপে ধোঁয়া দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ধোঁয়া লেলিহান শিখায় রূপ নেয় এবং বাতাসের দমকে আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের অবস্থান ছিল ফাতেমা তুজ জাহরা হলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপত্তার জন্য দ্রুত হল থেকে বের হয়ে খোলা মাঠে আশ্রয় নেন। ধোঁয়ার তীব্রতা এতটাই ছিল যে কিছু শিক্ষার্থী শ্বাসকষ্টের আশঙ্কায় মুখ ঢেকে নিরাপদ স্থানে সরে যান।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে আগুন নেভাতে এগিয়ে আসেন হলের নিরাপত্তাকর্মী, মালি ও ইলেক্ট্রিশিয়ানরা। আগুন লাগার পরপরই তারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই হাতে থাকা সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করেন। তাদের এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগেই আগুনের বিস্তার আংশিকভাবে ঠেকানো সম্ভব হয়। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সিলেট সদর ফায়ার সার্ভিস এর একটি দল এবং তারা পানি ছিটিয়ে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সরেজমিনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগুনে টিলার প্রায় ২০০ শতক এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া জমিতে গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপকভাবে। অনেক শিক্ষার্থী বলেন, আগুন লাগার সময় প্রশাসনের উপস্থিতি বিলম্বিত হওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিশেষ করে ধোঁয়া হলে ঢুকে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে কিছুটা সময় লাগায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে। তাদের অভিযোগ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা শাখার সুপারভাইজার আজিজুর রহমান জানান, আগুন নেভাতে গিয়ে আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। হলের ইলেক্ট্রিশিয়ান আজিজুল হকের শ্বাসনালিতে ধোঁয়া প্রবেশ করায় তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এবং অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছে। গার্ডেনার রাকিব হোসাইনও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। অন্য আহতরা হলেন নিরাপত্তাকর্মী রঞ্জন দাস, লিমন দাস, সুমন আহমদ এবং ইলেক্ট্রিশিয়ান সেলিম মিয়া। তাদের কারও হাত কেটে গেছে, কারও পা ছিটে গেছে, তবে চিকিৎসকদের মতে তারা আশঙ্কামুক্ত।
আগুনের সূত্রপাত নিয়ে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, টিলার পাশে থাকা আকাশমনি গাছের নিচে জমে থাকা শুকনো পাতা থেকে আগুনের সূচনা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম লিডার প্রীতম দাস জানান, কেউ বিড়ি বা সিগারেট খেয়ে জ্বলন্ত অংশ সেখানে ফেললে তা থেকেই আগুন লাগতে পারে। যদিও বিষয়টি নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে এবং প্রশাসন ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করছে।
নিরাপত্তাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, হলে থাকা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ ছিল। ফলে সেগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে তারা প্রত্যাশিত ফল পাননি এবং ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে শারীরিক সমস্যায় পড়েন। তাদের দাবি, যদি কার্যকর অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকত, তবে আগুন আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যেত এবং ক্ষয়ক্ষতি কম হতো। এই অভিযোগ ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিমকে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্বেগ ও দাবি জানায়। তারা বলেন, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভাতে কাজ করেছেন তাদের পুরস্কৃত করা উচিত, পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীরা আরও দাবি করেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পরিকল্পনা ও জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে যেকোনো বিপদে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান বলেন, আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসার সব ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহন করবে। শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলোর প্রতিও প্রশাসন ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে তিনি জানান। তবে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদোত্তীর্ণ থাকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে হল কর্তৃপক্ষ তাকে অবহিত করেনি এবং বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি বা টিলাবেষ্টিত এলাকায় আগুন লাগার ঝুঁকি বেশি থাকে। শুকনো পাতা, ঝোপঝাড় ও বাতাসের প্রবাহ আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তাই এমন এলাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং আগুন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শিক্ষাঙ্গনে এই সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন, কারণ সামান্য অবহেলাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জরুরি প্রস্তুতির প্রশ্ন। শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা মনে করছেন, আধুনিক নিরাপত্তা অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা ছাড়া এমন দুর্ঘটনা মোকাবিলা করা কঠিন। তারা আশা করছেন, প্রশাসন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ আহত কর্মচারীরা নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের এই সাহসিকতা ক্যাম্পাসে প্রশংসিত হয়েছে এবং অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যমে তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকে মনে করেন, এই ধরনের দায়িত্বশীল আচরণকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে অন্যরাও জরুরি পরিস্থিতিতে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবে।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনে দিয়েছে। প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সম্মিলিত উদ্যোগেই ভবিষ্যতে নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার নজর তদন্তের ফলাফল ও প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দিকে।