প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিহত হয়েছেন—এমন দাবি করেছে ইউরোপভিত্তিক আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা থিঙ্কট্যাংক সংস্থা ওসিন্ট। তবে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। শুক্রবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত বার্তায় সংস্থাটি জানিয়েছে, পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর বিশেষ অভিযানের সময় কাবুলে আখুন্দজাদা সহ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার প্রাণ হারান।
ওসিন্টের তথ্যানুসারে, পাকিস্তানের এই বিশেষ অভিযানটির নাম ‘অপারেশন গজব-লিল হক’। সংস্থার বরাতে জানা গেছে, তালেবান প্রধান আখুন্দজাদা ২০২১ সালে দল ও সরকারের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুরো শাসনব্যবস্থার প্রধান নীতিনির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার দিকনির্দেশনায় সরকারি কার্যক্রম ও দলের রাজনৈতিক নীতিমালা কার্যকর হতো। আখুন্দজাদার মৃত্যুর খবরটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন এক অস্থিরতার সূচনা করেছে।
এই ঘটনা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান তাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) নির্মূলের উদ্দেশ্যে আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিয়া প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। ওই হামলায় কমপক্ষে ৮০ জনের বেশি নিহত হন। এ ঘটনার জবাবে তালেবান তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। আফগান সেনাপ্রধান ফাসিহুদ্দিন ফিৎরাতের নির্দেশে আফগান বাহিনী ডুরান্ড লাইন এলাকায় পাকিস্তানি সেনাচৌকি লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া থাকে সঙ্গে সঙ্গে। আফগান বাহিনীর হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাকিস্তান তাদের পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান ‘অপারেশন গজব-লিল হক’ শুরু করে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং এখন থেকে শুধুমাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধান হবে। এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের মাঝেই তালেবান প্রধানের মৃত্যুর দাবি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আখুন্দজাদার মৃত্যু বা পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সামরিক উত্তেজনা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সংকটাপন্ন করতে পারে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয়ই সীমান্তবর্তী এলাকায় সেনা সমাবেশ ও কৌশলগত পদক্ষেপ বৃদ্ধি করেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, এই ধরনের সংঘাতকে দ্রুত কূটনৈতিক ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান না করা হলে এ অঞ্চলে মানবিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা গভীর হতে পারে।
আফগান ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, তালেবান প্রধানের অনুপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে শূন্যস্থান সৃষ্টি করতে পারে। দলের বিভিন্ন শীর্ষ কমান্ডার ও নীতিনির্ধারকরা ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারেন। একই সঙ্গে, আফগান জনগণের জন্য নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে।
পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ এবং তালেবান প্রধানের নিহত হওয়ার দাবির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলও সতর্ক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো শিগগিরই দ্বিপক্ষীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। সংঘাতের উষ্মা রোধ করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর না হলে, এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও মানবিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয়কে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, কেবল সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে বা ব্যক্তিগত লক্ষ্যবস্তু নাশ করার চেষ্টা করলে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে। আখুন্দজাদার মৃত্যু বা পাকিস্তানের অভিযান যাই হোক, এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, উভয় পক্ষকে সংঘাত কমাতে ও কূটনৈতিক সমাধানে উৎসাহিত করা।