প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু–এর এক বক্তব্য ঘিরে। তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ঘাটতি বা কষ্ট থাকলেও জাতিকে বিপুল ঋণের বোঝায় ফেলে রাখা ঠিক নয়। তার ভাষায়, কষ্ট সহ্য করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। সচিবালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া এই মন্তব্য ইতোমধ্যে অর্থনীতি ও জ্বালানি নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ–এর নির্বাহী কমিটির দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, অতীতে লোডশেডিং থাকলেও দেশের ওপর বিশাল ঋণের চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়লেও আর্থিক দায় এত বেশি যে তা জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে শুধু আলো জ্বলছে কি না তা দেখলেই হবে না; দেখতে হবে এর পেছনে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক দায় তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানের আগে তিনি নিজের দপ্তরে অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর–এর সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ও লোকসান নিয়ে একটি বৈঠক করেন। বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে যে বিদ্যুৎ খাতে মোট প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার আর্থিক দায় জমে আছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে পাওনা রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মত দেন। বাকি প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশে বহু কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখেই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তার ভাষায়, পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের সামঞ্জস্য না থাকলে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন টেকসই হয় না। তিনি এই পরিস্থিতিকে বিশৃঙ্খল বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস বা প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক ক্ষতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার দাবি, তার দায়িত্ব পালনের সময় এই হার ছিল প্রায় ছয় শতাংশ, যা এখন বেড়ে প্রায় দশ শতাংশে পৌঁছেছে। তার হিসাব অনুযায়ী এক শতাংশ ক্ষতি মানে প্রায় ৫০ লাখ টাকার সমপরিমাণ লোকসান। এই ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে তা অন্তত পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়। ভবিষ্যতে তিন শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সিস্টেম লস কমানো গেলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
এই আলোচনায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন ব্যবস্থার আর্থিক কাঠামো নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড–এর ওপর বিপুল অঙ্কের দায় জমে আছে, যা দ্রুত সমাধান না করলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই রাখতে হলে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ভবিষ্যতে আইএমএফ–এর মতো সংস্থার কাছ থেকে চাপ আসতে পারে। তাই তিনি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নতুন করে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান, যাতে উভয় পক্ষের স্বার্থ বজায় রেখে ব্যয় কমানো সম্ভব হয়। তার মতে, ন্যায্য সমঝোতা ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে স্থিতিশীলতা আনা কঠিন।
জ্বালানি সংকটের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এটি সাময়িক সংবাদ নয় বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। তিনি উল্লেখ করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি, ফলে বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। সরকার এখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এবং নতুন রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল ছাড়া এই উদ্যোগ সফল করা যাবে না। এজন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে আলাদা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথাও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ শুধু একটি পরিষেবা নয়, এটি দেশের শিল্প, কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই এই খাতকে শক্তিশালী করতে হলে পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ, ভর্তুকি কাঠামো এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাদের ধারণা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে ঋণ ও দায় কমাতে হলে স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবসম্মত ট্যারিফ নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সহনীয় মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিদ্যুৎমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ তার মন্তব্যকে বাস্তবতার প্রতিফলন বলে মনে করছেন, আবার কেউ বলছেন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি বা লোডশেডিং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকই একমত যে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য আর্থিক দায় কমানো এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সর্বোপরি, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক নয়, এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বিদ্যুৎমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা মূলত একটি নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি—তাৎক্ষণিক সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তার এই বক্তব্য ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতি ও অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনার পথ তৈরি করেছে।