প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শুক্রবার দুপুরে হঠাৎ কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে অনুভূত এই ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও মুহূর্তের মধ্যে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে খোলা জায়গায় অবস্থান নেন, কেউ কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে থাকেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি, তবু এই কম্পন জনমনে ভূমিকম্পভীতি নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৩, যা মাঝারি মাত্রার কম্পন হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ও গভীরতা সম্পর্কে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে ধারণা পাওয়া গেছে এটি ছিল অগভীর ভূমিকম্প। অগভীর ভূমিকম্প সাধারণত কম মাত্রার হলেও মানুষের কাছে বেশি অনুভূত হয়, কারণ কম্পনের উৎস ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকে।
ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার জানায়, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল সাতক্ষীরা থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে এবং ভারতের গোসাবা অঞ্চল থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। সংস্থাটি আরও জানায়, ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের ফলে সুনামির কোনো আশঙ্কা নেই, কারণ এর উৎপত্তিস্থল স্থলভাগে এবং গভীরতাও তুলনামূলক কম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভারতের টাকি শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। তবে তারা-ও নিশ্চিত করেছে যে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩ এবং গভীরতা প্রায় ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থল নির্ধারণে এ ধরনের সামান্য পার্থক্য আন্তর্জাতিক ভূকম্পন পর্যবেক্ষণে অস্বাভাবিক নয়, কারণ বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন সিসমিক নেটওয়ার্ক ও তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে।
ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পরপরই রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অফিস, বাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত অনেকেই নিরাপদ স্থানে চলে যান। বিশেষ করে বহুতল ভবনে থাকা বাসিন্দারা কম্পনের সময় স্পষ্ট দুলুনি অনুভব করেছেন বলে জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও পোস্টে দেখা যায়, অনেকেই দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্পের এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে অতীতের বড় ভূমিকম্পের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূতাত্ত্বিক গঠন এমন যে এ অঞ্চলটি একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে এখানে মাঝেমধ্যে ভূকম্পন হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই ঘটে, যদিও বড় মাত্রার ভূমিকম্প তুলনামূলক বিরল। তবে ছোট কম্পনগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত, কারণ এগুলো ভূত্বকের ভেতরে চাপ জমার ইঙ্গিত দেয়।
ভূমিকম্প নিয়ে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী এবং ভূমিকম্প সহনশীল নকশা না মানার কারণে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই এই ধরনের মাঝারি কম্পন বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটালেও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ চলছে। তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা আফটারশক বা পরকম্পন ঘটার সম্ভাবনা থাকে, যদিও তা সাধারণত কম মাত্রার হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্কুল, অফিস ও বাসাবাড়িতে নিয়মিত মহড়া হলে আতঙ্ক কমে এবং দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে ভূমিকম্পের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
এই ভূমিকম্পে বড় ক্ষতি না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি, মানসম্মত নির্মাণনীতি এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার দক্ষতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
দিনের ব্যস্ত সময়ের মধ্যে অনুভূত এই ভূকম্পন মানুষের মনে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি করলেও একই সঙ্গে সচেতনতার বার্তাও দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, কয়েক সেকেন্ডের সেই দুলুনি যেন মনে করিয়ে দিল—প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। তাই নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস।