সর্বশেষ :
চীনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে ৯ সামরিক কর্মকর্তা বরখাস্ত ভূমি সেবায় ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ আসছে: ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ আগে, অর্থের নিশ্চয়তা পরে: পানিসম্পদমন্ত্রী মির্জা ফখরুল জানালেন যথাসময়ে স্থানীয় নির্বাচন হবে চুয়েটে দ্বিতীয় ধাপের ভর্তি কার্যক্রম ১০ মার্চ গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দেবে সরকার: তথ্যমন্ত্রী ১০ মার্চ বগুড়ায় ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী কালীগঞ্জে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত ৫ রোজাদার সতীর্থদের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে চোটের অভিনয়, ভাইরাল গোলরক্ষক ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ, উৎস নিয়ে মিলল দুই তথ্য

রোজাদার সতীর্থদের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে চোটের অভিনয়, ভাইরাল গোলরক্ষক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
ইফতারে বিরতি নেই, মুসলিম সতীর্থদের জন্য ইনজুরির অভিনয় খ্রিষ্টান ফুটবলারের

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতা কিংবা বিনোদনের খেলা নয়, এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সম্মানের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি—এ কথা আবারও প্রমাণ করলেন অ্যান্থনি লোপেজ। ফ্রান্সের শীর্ষ ফুটবল প্রতিযোগিতা লিগ ওয়ান-এর এক ম্যাচে নিজের মুসলিম সতীর্থদের রোজা ভাঙার সুযোগ করে দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে চোটের অভিনয় করে সাময়িকভাবে খেলা বন্ধ করিয়ে তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

ঘटनাটি ঘটে গত রোববার এফসি নঁতে ও লে হাভরে এসি-এর মধ্যকার লিগ ম্যাচে। ম্যাচের সময় গড়াচ্ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এক পর্যায়ে, স্কোরবোর্ডে এগিয়ে ছিল নঁতে। খেলার ৭৪তম মিনিটে সূর্যাস্তের সময় ঘনিয়ে এলে মাঠে উপস্থিত মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য ইফতারের মুহূর্ত এসে পড়ে। কিন্তু ফরাসি ফুটবল নিয়ম অনুযায়ী ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে ম্যাচ থামানোর অনুমতি নেই। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোপেজ হঠাৎ নিজের হ্যামস্ট্রিং চেপে ধরে মাঠে বসে পড়েন এবং ব্যথার ভান করতে থাকেন। তার এই আচরণে ম্যাচ রেফারি খেলা থামাতে বাধ্য হন এবং চিকিৎসক দল মাঠে প্রবেশ করে।

খেলা বন্ধ হওয়ার সেই সংক্ষিপ্ত সময়টুকু নঁতের মুসলিম ফুটবলাররা কাজে লাগান। তারা দ্রুত মাঠের পাশে গিয়ে পানি ও খেজুর খেয়ে রোজা ভাঙেন। কয়েক মিনিট পর চিকিৎসা শেষে লোপেজ আবার স্বাভাবিকভাবে উঠে দাঁড়ান এবং খেলায় ফিরে যান। দর্শক ও ধারাভাষ্যকাররা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জানা যায়, সতীর্থদের ইফতারের সুযোগ করে দিতেই তিনি এই অভিনয়ের আশ্রয় নিয়েছিলেন।

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছেন লোপেজ। ফুটবল সমর্থকরা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পেশাদার খেলাধুলার মধ্যেও মানবিক মূল্যবোধ যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ। অনেকে মন্তব্য করেছেন, ধর্ম, বর্ণ বা সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও সহমর্মিতা দেখানোই প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ মনোভাব। ক্রীড়াবিদদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কেমন হওয়া উচিত, তার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে এই ঘটনাকে তুলে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষণেও।

ফরাসি ফুটবলের নীতিমালা অনুযায়ী ম্যাচ চলাকালে ধর্মীয় কারণে খেলা বন্ধ রাখা যায় না। কর্তৃপক্ষ মনে করে, একবার এই ধরনের বিরতির অনুমতি দিলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন কারণে ম্যাচের গতি ব্যাহত হতে পারে। তবে এই নীতির কারণে অনেক সময় রোজাদার খেলোয়াড়দের অসুবিধায় পড়তে হয় বলে সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন। এই প্রেক্ষাপটে লোপেজের উদ্যোগ অনেকের কাছে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেও দেখা হচ্ছে, যদিও তিনি নিজে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক বা নীতিগত বক্তব্য দেননি।

অন্যদিকে ইউরোপের সব লিগে নিয়ম একই নয়। উদাহরণস্বরূপ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ২০২১ সাল থেকে সূর্যাস্তের সময় রোজাদার খেলোয়াড়দের জন্য স্বল্প সময়ের বিরতি দেওয়ার অনুমতি দিয়ে আসছে। সেখানে রেফারিরা পরিস্থিতি বিবেচনা করে কয়েক মুহূর্তের জন্য খেলা থামান, যাতে খেলোয়াড়রা দ্রুত পানি বা খাবার গ্রহণ করতে পারেন। ফলে অনেকেই মনে করছেন, খেলোয়াড়দের ধর্মীয় প্রয়োজনের প্রতি সম্মান দেখাতে ফরাসি লিগ কর্তৃপক্ষেরও ভবিষ্যতে নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

ম্যাচের ফলাফলেও নঁতে আনন্দের উপলক্ষ পেয়েছে। তারা প্রতিপক্ষকে ২–০ গোলে পরাজিত করে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জন করে। তবে লিগ টেবিলের অবস্থান এখনো তাদের জন্য উদ্বেগজনক। ২৩ ম্যাচ শেষে মাত্র ১৭ পয়েন্ট নিয়ে তারা অবনমন অঞ্চলের ১৭তম স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ২৬ পয়েন্ট নিয়ে লে হাভরে অবস্থান করছে ১৩তম স্থানে। ফলে জয় পেলেও নঁতের সামনে এখনো কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা আনতে না পারলে মৌসুম শেষে অবনমনের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

তবু ম্যাচের ফলাফল ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে মানবিকতার দৃষ্টান্ত। ফুটবল মাঠে প্রায়ই দেখা যায় উত্তেজনা, বিতর্ক কিংবা সংঘর্ষের দৃশ্য। সেখানে এক খেলোয়াড়ের ছোট্ট উদ্যোগ কিভাবে বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে, এই ঘটনা তার বাস্তব উদাহরণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্রীড়াজগতের এই ধরনের ঘটনা তরুণ প্রজন্মকে সহমর্মিতা ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়, যা সমাজের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, লোপেজ মাঠে বসে পড়ার পর সতীর্থরা দ্রুত সাইডলাইনের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তারা পানি পান করেন এবং খেজুর খেয়ে রোজা ভাঙেন। এই দৃশ্য দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করে। অনেক সমর্থক মন্তব্য করেছেন, এটি শুধু ফুটবলের ঘটনা নয়, বরং মানবতার জয়। কেউ কেউ লিখেছেন, এমন উদাহরণ খেলাধুলাকে আরও সুন্দর করে তোলে।

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ধর্মীয় সহনশীলতার বিষয়টি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন লিগ ও সংগঠন এখন খেলোয়াড়দের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চাহিদা বিবেচনায় নতুন নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলোয়াড়রা যখন নিজেদের বিশ্বাস ও পরিচয় বজায় রেখেই পেশাদারিত্ব দেখাতে পারেন, তখন তাদের পারফরম্যান্সও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লোপেজের ঘটনা শুধু এক ম্যাচের গল্প নয়, বরং খেলাধুলার মানবিক ভবিষ্যতের একটি প্রতীকী ইঙ্গিত।

ঘটনার পর অনেক ফুটবল বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, মাঠে লোপেজের সেই মুহূর্তটি ছিল নিছক অভিনয় নয়, বরং সহমর্মিতার সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ একজন গোলরক্ষকের জন্য ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পড়ে যাওয়া মানে ঝুঁকি নেওয়া। প্রতিপক্ষ দল সেই সুযোগে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারত। তবুও তিনি সতীর্থদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই দৃষ্টান্ত খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা এবং দলীয় বন্ধনের শক্তি তুলে ধরে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, একটি ছোট্ট মুহূর্তই কখনো কখনো বড় বার্তা বহন করে। ফুটবল মাঠে ঘটে যাওয়া এই মানবিক দৃশ্য প্রমাণ করেছে, খেলাধুলার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু গোল বা জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি এবং মানবিকতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার আসল মহিমা। অ্যান্থনি লোপেজের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি ম্যাচের স্মৃতি হয়ে থাকবে না, বরং ক্রীড়াবিশ্বে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত