প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শুক্রবার দুপুরে হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক উত্তেজনায়, যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষটি শুধু দলীয় কার্যালয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে থানা প্রাঙ্গণ পর্যন্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে তিন পুলিশ সদস্যসহ মোট পাঁচজন আহত হন। ঘটনাটি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন করে উদ্বেগ ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে এবং এলাকাজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুর প্রায় বারোটার দিকে দলীয় কার্যালয়ে একটি বৈঠক চলছিল। বৈঠকে মহারাজপুর ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে আলোচনা স্বাভাবিক থাকলেও এক পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কথাকাটাকাটির সূত্রপাত হয় অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে মতবিরোধ থেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তর্ক হাতাহাতিতে রূপ নেয়। উপস্থিত নেতাকর্মীদের কেউ কেউ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। বরং দুই পক্ষ একে অপরের ওপর চড়াও হলে সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়তে থাকলে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ধাওয়া করে এবং ধাওয়া খেতে খেতে কয়েকজন থানা প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানেও উত্তেজনা থামেনি; বরং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। এ অবস্থায় পুলিশ সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে মারামারি থামাতে গিয়ে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতরা হলেন এএসআই জাহিদ, কনস্টেবল পিপলু ও সেলিম। এছাড়া সংঘর্ষে আরও দুজন নেতাকর্মী আহত হন বলে জানা গেছে। আহতদের স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ দ্রুত সরে যান এবং অনেক দোকানদার নিরাপত্তার স্বার্থে দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। বিশেষ করে থানা এলাকার মতো সংবেদনশীল স্থানে এমন ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দলীয় কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, শুরুতে তারা ভেবেছিলেন এটি হয়তো স্বাভাবিক বাকবিতণ্ডা। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। চিৎকার-চেঁচামেচি, ধাক্কাধাক্কি এবং দৌড়ঝাঁপ দেখে আশপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করলেও পরে নিরাপত্তার কারণে স্থান ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় নেতা মো. রাশেদ খান জানান, সকালে তিনি দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে নেতাকর্মীরা দেখা করতে আসেন। তিনি বলেন, সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে তাদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করেই কর্মীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি পরিকল্পিত ছিল না এবং তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফলেই ঘটেছে।
অন্যদিকে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেল্লাল হোসেন জানান, থানার সামনেই দলীয় কার্যালয়ে বৈঠক চলছিল। হঠাৎ করেই অংশগ্রহণকারীরা মারামারি করতে করতে রাস্তায় নেমে পড়ে এবং পরে থানার ভেতরে ঢুকে যায়। পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি থামাতে গেলে তারা আঘাতপ্রাপ্ত হন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, যদিও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। অনেক সময় এসব মতবিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে তা সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তারা মনে করেন, দলীয় নেতৃত্বের উচিত স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপ ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা, যাতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
এ ঘটনার পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং নতুন করে যাতে কোনো উত্তেজনা না ছড়ায় সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন সহিংসতার দিকে না যায়। কারণ এ ধরনের ঘটনা শুধু রাজনৈতিক পরিবেশ নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সামনে সংঘর্ষের ঘটনা জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা ও সহনশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে আরও কঠোর হওয়া।
ঝিনাইদহ জেলার ঝিনাইদহ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন আলোচনা চলছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সহনশীলতা নিয়ে। স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে মতবিরোধ হলেও তা সহিংসতায় রূপ না নেয়। তারা মনে করেন, গণতান্ত্রিক চর্চার মূল শক্তি হচ্ছে মতের ভিন্নতা মেনে নেওয়া এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা।
সবশেষে বলা যায়, শুক্রবারের এই সংঘর্ষ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বাস্তবতার প্রতিফলন। যদিও পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবুও উত্তেজনার রেশ পুরোপুরি কাটেনি। সংশ্লিষ্ট সবাই এখন অপেক্ষা করছেন পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর না তৈরি হয় এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকে।