প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের শীর্ষ রাজনৈতিক সভার কয়েক সপ্তাহ আগে দেশটিতে সামরিক এবং প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বড়সড় অপসারণের ঘটনা ঘটেছে। ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (এনপিসি) স্ট্যান্ডিং কমিটি শুক্রবার ঘোষণা করেছে, আইন প্রণেতাদের তালিকা থেকে মোট ১৯ জন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে নয়জন সামরিক কর্মকর্তা রয়েছেন।
এই পদত্যাগ বা বরখাস্তের কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ এখনও জানানো হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং কর্তৃক নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। শি চিনপিং আগে থেকেই তার নিকটতম মিত্র এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষমতা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো শি কর্তৃক সর্বোচ্চ পদমর্যাদার জেনারেল এবং ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র ঝাং ইউক্সিয়াকে তার পদ থেকে অপসারণ।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, অপসারণ তালিকায় রয়েছেন পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) গ্রাউন্ড ফোর্সের কমান্ডার লি কিয়াওমিং এবং পিএলএ নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার শেন জিনলং। এছাড়াও তালিকায় কয়েকজন প্রাদেশিক কর্মকর্তা এবং অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার প্রাক্তন দলীয় প্রধান সান শাওচংও রয়েছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে চীনে এক বিশাল শুদ্ধি অভিযানের সময়ও নয়জন শীর্ষ জেনারেলকে তাদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। ওই সময় কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এই অভিযান কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের অংশ। শি চিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে উচ্চ ও নিম্ন স্তরের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে চলমান এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে পার্টির শক্তি সংরক্ষণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নিজেও এই অভিযানের সময় বারবার বলেছেন যে দুর্নীতি হল কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে বড় হুমকি।
তবে সমালোচকরা বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আড়ালে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা মনে করছেন, শি চিনপিং প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণ ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক বিপর্যয় রোধের কৌশল হতে পারে।
এনপিসি’র পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিষ্কার হচ্ছে যে, চীনের ক্ষমতায় থাকা নেতৃত্বের মধ্যে শি চিনপিংকে সমর্থন না দেওয়া বা তার নীতির সঙ্গে অসম্মতি প্রকাশ করা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণের ফলে সেনাবাহিনীতে তার প্রভাব আরও দৃঢ় হবে। এতে তিনি সামরিক নেতৃত্বের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন।
বিশ্বের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শি চিনপিংয়ের লক্ষ্য হল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বজায় রাখা, এবং রাজনৈতিক, সামরিক এবং প্রশাসনিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা। চীনের শীর্ষ পর্যায়ের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ চীনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ, যেখানে শীর্ষ নেতা তার নিকটতম সহযোগীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে থাকেন। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়া কখনও কখনও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূলের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
চীনের সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এই ধরনের পদক্ষেপগুলো বিদেশী বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বার্ষিক রাজনৈতিক সভা, যা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তার আগে এই ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিক পরিবেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং প্রাদেশিক নেতাদের সরানো শি চিনপিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। এটি তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বজায় রাখতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে এবং পার্টি অভ্যন্তরের নিয়ম ও শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
চীনের সামরিক এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ের এই পরিবর্তনগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরকেড়ে নিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের পদক্ষেপ চীনের নীতি-নির্ধারণ এবং সামরিক কৌশলের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে শি চিনপিংয়ের ক্ষমতা আরও দৃঢ় হবে।
এই অপসারণ তালিকার প্রভাব এবং তা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শি চিনপিংয়ের লক্ষ্য শুধুমাত্র দুর্নীতিমুক্তি নয়, বরং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও।