প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো নিজ কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ে বসলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে অনুষ্ঠিত এ সভা ছিল নতুন সরকারের প্রশাসনিক কর্মকৌশল ও অগ্রাধিকার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। সভায় প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে যে বার্তা দিয়েছেন, তা সরকারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত বহন করে।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই দেশকে আমাদের প্রথম ও শেষ ঠিকানা বলে মনে করি। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের দায়িত্ব আমাদের সবার। এই কথার মধ্য দিয়ে তিনি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, সরকার একক কোনো ব্যক্তি বা দপ্তরের বিষয় নয়; এটি একটি সমন্বিত কাঠামো, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু নীতিনির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সমন্বয় প্রয়োজন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সেবা প্রদানের মান উন্নত করতে এবং জনগণের কাছে সরকারকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে কর্মকর্তাদের নিষ্ঠা ও সততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী মেনিফেস্টো বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মেনিফেস্টোর প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কার, নারী শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নসহ ঘোষিত প্রতিটি অঙ্গীকার পূরণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সভায় তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। নাগরিকরা যেন নিজেদের নিরাপদ মনে করেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সব পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন।
দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী সতর্কতা জারি করেন। সরকারি নথি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ম-নীতি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন তিনি। তার মতে, একটি সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার মানদণ্ড অটুট রাখা অপরিহার্য।
সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, হুমায়ুন কবির, শামসুল ইসলাম, ডা. জাহেদ উর রহমান এবং মাহ্দী আমিন। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী কার্যালয়ের গঠন ও কার্যাবলী বিষয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
মতবিনিময় সভায় কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে সভাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে নিজেদের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন। অনেকে প্রশাসনিক কাঠামো আরও দক্ষ ও জনবান্ধব করার বিষয়ে মতামত দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রশাসনের সঙ্গে এমন সরাসরি মতবিনিময় একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করছেন।
জনগণের প্রত্যাশা, উন্নয়ন ও সুশাসনের অঙ্গীকার এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনের বার্তা—সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার একটি রূপরেখা। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। প্রশাসনের প্রতিটি সদস্য যদি দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখেন, তবে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
সভা শেষে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার লক্ষ্য করা যায়। নতুন সরকারের অগ্রযাত্রায় প্রশাসনের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দেশকে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও উন্নয়নমুখী পথে এগিয়ে নিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
এই মতবিনিময় সভা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং এটি ছিল প্রশাসনিক কাঠামোকে সক্রিয় ও দায়বদ্ধ রাখার একটি প্রয়াস। সামনে যে চ্যালেঞ্জই আসুক, সরকার ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই তা মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি—এমন বার্তাই উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।