প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ প্রকাশিত প্রায় আট মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘মেজর কমব্যাট অপারেশনস’ বা বড় আকারের সামরিক কার্যক্রম শুরু করেছে।
ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা পূরণে রাজি হয়নি। তার ভাষায়, ‘ইরান আমাদের যা প্রয়োজন, তা দিতে চায়নি। তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার একটি চুক্তির চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ‘সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন’ করে দেবে। যদিও এসব দাবির স্বাধীন ও তাৎক্ষণিক যাচাই সম্ভব হয়নি, তবে তার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে হামলার বিষয়ে তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের আলোচনার অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হোয়াইট হাউসের লনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যখন যুদ্ধ হয়, তখন সবকিছুরই ঝুঁকি থাকে—ভালোও, খারাপও।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষই তখন সীমিত অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে সামরিক অভিযানের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের ঘোষণার বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে তেহরানের রাজনৈতিক মহলে পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। ইতোমধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, জ্বালানি বাজার এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সম্পর্ক বহু বছর ধরে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরাসরি সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে দ্রুত অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতার আভাস মিলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকরা বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় পদক্ষেপ বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক মহল উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি যোগাযোগের চ্যানেল খোলা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়ানো যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অভিযান কতদূর গড়াবে এবং এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হবে নাকি সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে—তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর।
বিশ্ব রাজনীতির এ স্পর্শকাতর মুহূর্তে সামরিক ও কূটনৈতিক দুই পথই খোলা রয়েছে। তবে যে পথই বেছে নেওয়া হোক, তার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে না শুধু সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যে; বরং তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে।