প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন চরমে, ঠিক সেই সময় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে—দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অক্ষত আছেন। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-ও নিরাপদ রয়েছেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার খবরে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন এই তথ্য কিছুটা হলেও পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তা কমিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা Islamic Republic News Agency-র বরাতে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক স্থাপনা চিহ্নিত করা হলেও প্রেসিডেন্ট সরাসরি কোনো আঘাতের মুখে পড়েননি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা Reuters জানিয়েছে, ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে রাজধানী তেহরান থেকে ‘নিরাপদ স্থানে’ স্থানান্তর করা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রটি উল্লেখ করে। যদিও তার অবস্থান বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে তাকে অক্ষত ও সুরক্ষিত বলেই দাবি করা হয়েছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম Channel 12-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় ইরানের মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বাসভবন, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের স্থাপনা এবং প্রেসিডেন্টের ভবনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই যৌথ অভিযানের খবরে তেহরানজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও সরকারি বার্তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই হামলার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরান সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা তোমাদের সতর্ক করেছিলাম। এখন তোমরা এমন একটি পথে যাত্রা শুরু করেছ যার শেষ আর তোমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’ তার এই বার্তা স্পষ্টতই পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত বহন করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন অভিযোগ সত্য হলে এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে টার্গেট করার শামিল, যা আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও তুলতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে একাধিকবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক এই হামলার খবরে আশঙ্কা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বিশ্ব সম্প্রদায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কূটনৈতিক মহল থেকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
তবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও সর্বোচ্চ নেতা খামেনির অক্ষত থাকার খবর ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতৃত্ব নিরাপদ রয়েছে—এই বার্তা জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই উত্তেজনা কতদূর গড়াবে এবং পাল্টা পদক্ষেপের মাত্রা কী হতে পারে। ইরানের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তার ইঙ্গিত মিললেও বাস্তব পদক্ষেপ কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে আপাতত রাষ্ট্রীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব অক্ষত রয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।