প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহে এক মতবিনিময় সভায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিস্ট শক্তির বিচার নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের প্রধান অঙ্গীকার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং আইনসঙ্গত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অতীতের অন্যায়-অবিচারের বিচার সম্পন্ন করা হবে। সরকারের অবস্থান পরিষ্কার—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
শনিবার সকালে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার সংসদ সদস্য ও কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় উঠে আসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মান নিশ্চিত করার বিষয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন অপকর্মের কারণে সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। তিনি মন্তব্য করেন, দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী শক্তির পতন ঘটিয়েছে ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই কেবল ক্ষমতায় আসার জন্য নয়; বরং আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। সরকার মাত্র এক সপ্তাহ ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ধাপে ধাপে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সাংবিধানিক বিধান অনুসারে জারি করা এসব অধ্যাদেশ আগামী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগুলো পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই আইনগত ভিত্তি সুসংহত হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার মহাসড়কে। এই পথচলায় আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। সরকারের দায়িত্ব শুধু উন্নয়ন করা নয়; উন্নয়নের সুফল যেন সঠিকভাবে জনগণের কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি টাকার স্বচ্ছ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্নীতির বিষয়ে তিনি কঠোর বার্তা দেন। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মে জড়িত হন, তবে কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, ফৌজদারি মামলাও করা হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। তার ভাষায়, জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।
সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর অপরাধের প্রসঙ্গেও আইনমন্ত্রী কথা বলেন। নরসিংদীর আলোচিত ধর্ষণ মামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি উল্লেখ করেন, মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। নরসিংদী ও ঝিনাইদহের শিশু তাবাসসুম হত্যা মামলাও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে বলে তিনি জানান। অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উন্নয়ন খাতের কাজের মান নিয়ে আপস না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণে কোনো ধরনের নিম্নমান বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না। কোনো ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উন্নয়ন মানে কেবল কাজের উদ্বোধন নয়; দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই ফল নিশ্চিত করা।
কমিশন বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি দমনে সরকার ও বিরোধীদলের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন—চাঁদাবাজি, হুমকি-ধামকি বা দখলবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বিশেষভাবে ঝিনাইদহের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলেন, আজকের পর থেকে এসব অপকর্ম বরদাস্ত করা হবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই সময়ের শহিদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেসব ব্যক্তি সে সময় অপরাধে জড়িত ছিল, তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হবে না।
সভায় উপস্থিত স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারাও তাদের বক্তব্যে জেলার উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মতামত দেন। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আইনমন্ত্রীকে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানানো হয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া নেতৃবৃন্দ সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও বিচারপ্রক্রিয়ার গতিশীলতাকে স্বাগত জানান।
সামগ্রিকভাবে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে অতীতের অন্যায়-অবিচারের বিচার সম্পন্ন করার অঙ্গীকার, অন্যদিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও উন্নয়নের মান নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার অতীত অতিক্রম করে একটি আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই সরকার এগোতে চায় বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য সেই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জনগণের প্রত্যাশা—বক্তব্যের সঙ্গে কার্যক্রমের সামঞ্জস্য থাকবে এবং ন্যায়বিচারের পথ আরও সুদৃঢ় হবে।