প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ নতুন করে চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান ইসরাইলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। উত্তর ইসরাইলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যা মুহূর্তেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। রাতের নীরবতা ভেঙে সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ ও আকাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও উৎকণ্ঠাপূর্ণ করে তোলে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পরপরই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। হুমকি প্রতিহত করতে বিমান বাহিনী কাজ করছে এবং প্রয়োজনে পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতিও রয়েছে। সামরিক সূত্র বলছে, কমপক্ষে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের দিকে ছোড়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি খোলা জায়গায় আঘাত হেনেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরাইল’-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জরুরি সেবা সংস্থাগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আরও একটি সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সংকেত শনাক্ত করেছে বলে জানিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সামরিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বিবৃতিতে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স উল্লেখ করেছে, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। সাধারণ নাগরিকদের হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সামরিক কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি অপ্রবেশযোগ্য নয়। তাই নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলা, যা ইরানের সামরিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সেই অভিযানের প্রতিক্রিয়াতেই ইরান সরাসরি ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা নতুন নয়। তবে সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সংঘাতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা সবসময়ই আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্বিগ্ন করে। ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ‘আত্মরক্ষামূলক’। যদিও ইসরাইল এটিকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
উত্তর ইসরাইলের সাধারণ মানুষ হঠাৎ করে সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আলো এবং দূরে বিস্ফোরণের ঝলকানি। যদিও এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবু স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ স্পষ্ট। অনেকে নিরাপদ কক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ কেউ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। কারণ, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা দ্রুত বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও পড়বে। জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সবখানেই অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে সফল হলেও শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে বলছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের ভেতরেও সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ও সামুদ্রিক রুটে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সতর্কতা নেওয়া হতে পারে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ইসরাইলে পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী সতর্ক অবস্থানে আছে এবং সম্ভাব্য নতুন হামলা প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই নতুন অধ্যায় বিশ্বকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছুই এখন সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলছে। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর