যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি সিপিডির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি সিপিডির

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিকে চরমভাবে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, এই চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, শিল্পায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে হওয়া এ চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনে বাতিলের আহ্বান জানান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শনিবার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও করণীয় বিষয়ে বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরে সিপিডি। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তিকে বিশেষভাবে আলোচনায় আনা হয়। ড. খন্দকার বলেন, এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার ভাষায়, এটি মসৃণ রূপান্তর কৌশল বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে পারস্পরিক সুবিধা ও ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সিপিডির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিশেষ করে শুল্ক কাঠামো ও বাজার প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত বিধানগুলো দেশীয় শিল্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই একটি নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে সমতা ও পারস্পরিক লাভ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জাপানের সঙ্গে সম্পাদিত ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা ইপিএ নিয়েও প্রশ্ন তোলে সিপিডি। সংস্থাটি মনে করে, এ চুক্তির কিছু শর্ত দেশের জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন হলেও কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি সেই গতি কমিয়ে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন ড. খন্দকার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে সরে এসে সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কয়লা উত্তোলনের নতুন উদ্যোগ দেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। একইসঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন কূপ অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌরশক্তি ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

শ্রমবাজারের প্রসঙ্গেও সিপিডি উদ্বেগ প্রকাশ করে। ড. খন্দকার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ইপিজেড বা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে আলাদা কাঠামোয় না রেখে একটি সমন্বিত ওয়েজ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। এতে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে বলে মত দেন তিনি।

সংসদীয় জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক। তার মতে, জাতীয় সংসদ সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বেসরকারি বিল উপস্থাপন ও আলোচনার সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বকে কার্যকর করতে বিরোধীদলের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। স্থায়ী কমিটিগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালী না হলে নীতির বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সফল করতে স্থানীয় প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করা জরুরি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও সতর্কবার্তা দেন তিনি। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার মাধ্যমে। তাই বহুমুখী জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি স্পষ্ট করে জানায়, তাদের প্রস্তাব ও সমালোচনা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং নীতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দেওয়া সুপারিশ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি নীতি অপরিহার্য বলে মনে করে সংস্থাটি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সতর্কতা ও কৌশলগত পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য চুক্তি কেবল রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যম নয়; এটি দেশের শিল্পনীতি, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই সিপিডির এই আহ্বান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে অর্থনৈতিক কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কারের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে এই সুপারিশগুলোর প্রতি কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় কী পরিবর্তন আনা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত