প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসরায়েল ও United States–এর হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন—এমন খবরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা Fars News Agency কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তার মৃত্যুর ঘোষণা দেয় এবং দেশজুড়ে ৪০ দিনের শোক পালনের কথা জানায়। সরকারি বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘কাপুরুষোচিত হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এমন একজন মানুষ খুব কমই আছেন যিনি নির্বাচনী মঞ্চে কম উপস্থিত থেকেও রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। খামেনি ছিলেন তেমন এক চরিত্র। তার সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলত। পররাষ্ট্রনীতি থেকে সামরিক কৌশল—সবখানে ছিল তার চূড়ান্ত মতামত।
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেন আলী হোসেইনি খামেনি। তার পরিবার ছিল ধর্মীয় শিক্ষায় সমৃদ্ধ। কৈশোরেই তিনি ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। পরে শিয়া মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র কোম শহরে অধ্যয়ন করেন। এখানেই তার রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে।
১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি–বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। নেতৃত্বে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে খামেনিকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হতে হয়। কারাবাস তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ইরানের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনে খামেনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর সংগঠনে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে এই বাহিনী রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়।
১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। হামলায় তার ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর দায় চাপানো হয়। একই বছর ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই নিহত হন। রাজাইয়ের মৃত্যুর পর খামেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা আট বছর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যু ইরানে নেতৃত্ব সংকট তৈরি করে। ধর্মীয় আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। সে সময় তার ধর্মীয় পদমর্যাদা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। সংবিধানে সংশোধন আনা হয় এবং তাকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়। এভাবেই তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার ক্ষমতা ছিল বিস্তৃত। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, বিচার বিভাগের নিয়োগদাতা এবং পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশক—সব ভূমিকাই তার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচিত হলেও তাদের নীতির চূড়ান্ত অনুমোদন আসত তার দপ্তর থেকে।
তার শাসনামলে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। পশ্চিমা বিশ্ব একে সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখলেও তেহরান দাবি করেছে এটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। আঞ্চলিক রাজনীতিতে সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেন ইস্যুতেও ইরানের প্রভাব বিস্তার ঘটে তার সময়েই।
সমালোচকেরা মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নে তার নীতিকে কঠোর বলে আখ্যা দিয়েছেন। সমর্থকেরা বলেন, পশ্চিমা চাপের মুখেও তিনি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছেন। এই দ্বৈত মূল্যায়ন তার উত্তরাধিকারকে জটিল করে তুলেছে।
যদি তার মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়, তবে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। ততদিন রাষ্ট্রযন্ত্র অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় পরিচালিত হতে পারে।
বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মী থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আরোহণ—খামেনির জীবনযাত্রা এক নাটকীয় ইতিহাস। ব্যক্তিগত ত্যাগ, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে দীর্ঘ অবস্থান তাকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে। তার অধ্যায় শেষ হলে ইরান ও পুরো অঞ্চল নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।