প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। আলো পৌঁছেছে প্রত্যন্ত গ্রামেও। তবু স্বস্তি আসেনি গ্রাহকের বিলের খাতায়। একের পর এক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে দৃশ্যমানভাবে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের ঘোষণা আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামী দুই বছর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে চায় সরকার।
তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ নয়। কারণ বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে বিপুল দেনার চাপে জর্জরিত। বার্ষিক লোকসান ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব। ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দিতে হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা সহায়তার শর্ত নিয়েও রয়েছে আলোচনা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে বারবার তাগিদ দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে দাম অপরিবর্তিত রাখার কৌশল নির্ধারণের নির্দেশ দেন। আলোচনায় গুরুত্ব পায় সিস্টেম লস কমানো। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত যেসব কারিগরি ও অব্যবস্থাপনা জনিত ক্ষতি ঘটে তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্থিক ঘাটতি কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, শুধু সিস্টেম লস কমিয়ে সামগ্রিক সংকট কাটানো কঠিন। জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন গণমাধ্যমে বলেন, সিস্টেম লস কমিয়ে হয়ত পাঁচ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। কিন্তু বার্ষিক লোকসান যদি ৫৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়, তাহলে সামান্য সাশ্রয় বড় চিত্র বদলাতে পারবে না। অর্থনীতির ওপর চাপ তখনও বিশাল থাকবে।
গত ১৬ বছরে বিদ্যুতের দাম গ্রাহক পর্যায়ে অন্তত ১৪ বার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়। নতুন নতুন কেন্দ্র স্থাপন হয়। তবে সেই সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, উচ্চমূল্যের জ্বালানি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের ভারী বোঝা।
ক্যাপাসিটি চার্জ এখন বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম আলোচিত ইস্যু। উৎপাদন হোক বা না হোক, কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। গত বছর এ খাতে ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে। ফলে সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিচ্ছে। চুক্তির শর্ত পুনর্বিন্যাস কিংবা অর্থপ্রদানের কাঠামো পুনরালোচনার মাধ্যমে চাপ কমানো যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য আরও সরাসরি। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, দুর্নীতি ও অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রকৃত সমাধান মিলবে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ বন্ধ রাখলে বছরে ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।
বর্তমানে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বাস্তবে ব্যবহার হচ্ছে তার অর্ধেকেরও কম। অন্যদিকে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট খরচ অনেক বেশি। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা এ খরচ আরও অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহারের দিকে কৌশলগত ঝোঁক বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ ও প্রকৌশলীরা।
আরেকটি বড় প্রশ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ, ট্যারিফ প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং চুক্তির শর্ত যাচাইয়ে শক্তিশালী তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। স্বচ্ছতা বাড়লে বিনিয়োগ পরিবেশও সুসংহত হবে, আবার গ্রাহকের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে।
সরকারের সামনে তাই বহুমাত্রিক সমীকরণ। একদিকে জনস্বার্থে দাম স্থির রাখা। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা। উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। আবার বিনিয়োগকারীদের আস্থাও টিকিয়ে রাখতে হবে। এই জটিল সমীকরণে দ্রুত সমাধান পাওয়া সহজ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো, গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো ছাড়া টেকসই সমাধান মিলবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ চাহিদা পূর্বাভাসে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দরকার, যাতে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি না হয়।
গ্রাহকদের প্রত্যাশা স্পষ্ট। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ চাই, কিন্তু বিলের বাড়তি চাপ নয়। ব্যবসায়ী মহলও উৎপাদন খরচ স্থিতিশীল রাখতে বিদ্যুতের দামের পূর্বানুমানযোগ্যতা চায়। ফলে সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন হলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তবে সময়ই বলবে, আর্থিক সংকট ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার ভেতর দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ খাত কতটা সংস্কার সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই হয়ত দাম না বাড়িয়েও খাতটিকে টেকসই পথে ফেরানো যাবে। আলো জ্বলবে ঘরে ঘরে, আবার অর্থনীতির ওপর অন্ধকার নেমে আসবে না— এমন ভারসাম্য অর্জনই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।