ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতিতে একা এনসিপি?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
  • ২৬ বার
এনসিপি ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতি

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তরুণ নেতৃত্বের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা দাবি করছেন, দেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানে কার্যত তারাই সবচেয়ে সক্রিয় এবং প্রয়োজন হলে একাই রাজপথে আন্দোলনে নামতে প্রস্তুত। যদিও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে, ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত কয়েক বছরের অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা প্রায় দেড় বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল এবং সেই সময়ে বিভিন্ন দল ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের কথা বললেও নির্বাচনের প্রাক্কাল ও পরবর্তী সময়ে সেই ঐক্যে ফাটল দেখা যায় বলে অভিযোগ করছে এনসিপি। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের রাজনীতি সামনে আসতেই অনেক দল তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে, কিন্তু তারা তাদের পূর্বঘোষিত নীতিতে অটল রয়েছে।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, জুলাই আন্দোলনে দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল এবং সেই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল স্বৈরাচার ও বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা। তার দাবি, জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে সামনে এনেছে, সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এনসিপি এড়িয়ে যেতে পারে না। তবে তিনি এটিও বলেন, এই লড়াই শুধু একটি দলের নয়; সব রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে।

দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কৌশলে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং একই সঙ্গে বিদেশি প্রভাবের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তার ভাষায়, এই দুই প্রশ্নে এনসিপি আপসহীন অবস্থানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য দলগুলো প্রকাশ্যে একমত নয় এবং তারা বলছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ঈদুল ফিতরের পর রাজপথে কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে জোরদার করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে জনমত সংগঠিত করা। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তারা অন্যান্য দল ও সংগঠনের সঙ্গেও যোগাযোগ করবে, যাতে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায়।

এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তারা আশঙ্কা করছেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তার অভিযোগ, কোনো শক্তি যদি অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে, তবে তা প্রতিহত করা হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে এবং এগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে এনসিপির নেতারা অভিযোগ তুলেছেন যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে তারা প্রত্যাশিতভাবে সক্রিয় হয়নি। বিশেষ করে আন্দোলন, বিচার দাবি ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থানকে তারা যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেনি বলে এনসিপির দাবি। তবে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা পৃথক বক্তব্যে জানিয়েছেন, তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিবর্তনে বিশ্বাসী এবং আন্দোলনের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় তাদের ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে—এই প্রশ্নে নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলেছে। এনসিপির অভিযোগ, এই ভোটব্যাংক আকর্ষণে বড় দলগুলো নানান কৌশল নিয়েছে, যদিও সংশ্লিষ্ট দলগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন-কে অপসারণের দাবিতেও এনসিপি আন্দোলনে যায়, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বিএনপি সরাসরি বিরোধিতা করে এবং জামায়াত তুলনামূলক নীরব অবস্থান নেয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এনসিপি আবারও রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি তুলেছে। দলটির নেতারা মনে করেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসন একটি জটিল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং তা বাস্তবায়নে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন।

দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা ঘটনাই প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তন আনা জরুরি। তার মতে, অতীতের বিভিন্ন ঘটনা তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করেছে এবং সেই প্রজন্ম এখন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দেখতে চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এনসিপির নীতি হচ্ছে আপসহীন অবস্থান থেকে গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন দল হিসেবে এনসিপি নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে এবং সেটি রাজনীতির স্বাভাবিক কৌশল। নতুন দলগুলো সাধারণত জনসমর্থন বাড়াতে শক্ত অবস্থান ও উচ্চস্বরে বক্তব্য দেয়, যা রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করতে সহায়ক হয়। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, বাস্তব রাজনীতিতে একক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন এবং শেষ পর্যন্ত জোট বা সমঝোতার রাজনীতিতে অংশ নিতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে আন্দোলননির্ভর হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংসদীয় প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিবর্তনের চেষ্টা বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজপথ ও সংসদ—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করতে পারলেই কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে। এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের ঘোষিত নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন এক নতুন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো দল, নতুন শক্তি ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা—এই তিনের সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারিত হবে। এনসিপি নিজেকে সেই পরিবর্তনের প্রধান বাহক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, কিন্তু বাস্তবে তারা কতটা একা এবং কতটা সমর্থন পাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়ই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত