প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। সীমান্ত পেরিয়ে পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ। সোমবার ভোর থেকে লেবাননের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানী বৈরুত–এর দক্ষিণাঞ্চল দাহিয়েহ এলাকা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও এবারকার হামলা সংঘাতকে সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলে তাদের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর বড় ধরনের রকেট হামলার জবাব হিসেবেই এই আক্রমণ শুরু করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, লেবাননজুড়ে সংগঠনটির সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রাগার ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনে অভিযান আরও বিস্তৃত করা হবে। ইসরাইলি সামরিক সূত্র দাবি করেছে, তাদের লক্ষ্য শুধু হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করা, সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করা নয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের তীব্রতায় আবাসিক ভবন কেঁপে ওঠে এবং বহু মানুষ আতঙ্কে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান।
স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতিবেদনে জানা গেছে, দাহিয়েহ অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টা ধরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রাতভর আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর আগুনের ঝলকানি দেখতে পান বাসিন্দারা। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, যদিও হতাহতের সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও কিছু এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই সংঘর্ষের সূচনা ঘটে হিজবুল্লাহর দাবি করা এক হামলার মধ্য দিয়ে। সংগঠনটি জানায়, তারা ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফা–এর একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল প্রতিশোধমূলক হামলা, যা চালানো হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার প্রতিক্রিয়ায়। সংগঠনটি দাবি করেছে, তাদের নেতা ও যোদ্ধাদের হত্যার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সুযোগমতো প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
হিজবুল্লাহর বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ইসরাইল যে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, তা বিনা চ্যালেঞ্জে চলতে দেওয়া হবে না। তারা এটিকে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে বলেছে, এই হামলা ছিল একটি সতর্কবার্তা। বিশ্লেষকদের মতে, এমন ভাষা সাধারণত বড় ধরনের সংঘর্ষের পূর্বাভাস দেয়, কারণ এতে কৌশলগত অবস্থান থেকে সরাসরি সামরিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়।
ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তর সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এমন কোনো শক্তিকে সুযোগ না দেওয়া, যারা তাদের ভূখণ্ডে হামলার হুমকি সৃষ্টি করে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে ইসরাইল পরিস্থিতিকে সীমান্ত সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলেও প্রয়োজনে বৃহত্তর সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত রয়েছে।
অন্যদিকে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সংঘর্ষ কেবল দুটি পক্ষের লড়াই নয়; বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের অংশ। কারণ হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই ইরান–সমর্থিত সংগঠন হিসেবে পরিচিত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে তা আঞ্চলিক জোট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় নাগরিকদের অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা। বৈরুতের এক বাসিন্দা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় এবং মুহূর্তেই বুঝতে পারেন পরিস্থিতি ভয়াবহ। তিনি জানান, পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়তে হয়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক বাসিন্দা, যারা বলছেন যে সংঘর্ষের প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক তাদের ঘিরে রাখছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা দ্রুতই বেসামরিক মানুষের জন্য বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। তারা উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতি শান্ত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করার অনুরোধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থী সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ও তীব্র হতে পারে, যা ইতোমধ্যে সংকটে থাকা অঞ্চলের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি, অন্যদিকে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংগঠন—এই দ্বৈত বাস্তবতা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা বলছেন, পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে এটি আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতেও পড়বে।
বিশ্বশক্তিগুলো ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে এখনই সমঝোতার পথ খোঁজা না হলে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর এই সাম্প্রতিক সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি পাল্টা হামলা শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের নতুন অধ্যায় রচনা করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে এতটুকু নিশ্চিত যে এই সংঘাতের প্রতিধ্বনি কেবল সীমান্তেই থেমে থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হবে।