পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতায় মরছে বলেশ্বর নদী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
বলেশ্বর নদী পানি সংকট সমাধান

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পিরোজপুরের প্রাণকেন্দ্রিক নদী বলেশ্বর আজ মৃত্যুর প্রান্তে। নদীর মাঝখানে শহর রক্ষার নামে ব্লক ফেলে বাঁধ তৈরি করার কারণে নদী খননের প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়েছে। এর ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে, যাত্রী ও মালবাহী নৌযান আটকে গেছে এবং পানির অভাবে পিরোজপুর পৌরসভার একমাত্র ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট সংকটে পড়েছে। কৃষি কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। নদী এলাকায় স্থানীয়দের মতে, এক সময় প্রমত্তা বলেশ্বর নদের পানি পর্যাপ্ত ছিল, যার কারণে নৌপরিবহন সহজতর এবং মাছ ধরার মতো আয়-উপার্জনও সম্ভাবনাময় ছিল।

খেয়াঘাটের মাঝি মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বলেশ্বর নদীতে নৌকা চালাচ্ছি। এক সময় এই নদীতে প্রচুর পানি ছিল, গভীরতা অনেক। জাহাজ, ট্রলার, নৌকা চলাচল করত। জেলেরা মাছ ধরত। তবে সাত থেকে আট বছর আগে শহর রক্ষার নামে নদীতে ব্লক ফেলে বাঁধ নির্মাণের কারণে এখন নদীতে চর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নৌ চলাচল বন্ধ, যাত্রীদের ঘন্টাখানেক বা তার বেশি সময় নদীর মাঝে বসে থাকতে হয়। অনেকে হেঁটে পারাপার হয়।’

নদীর নাব্যতা হ্রাস ও পানি কমে যাওয়ার কারণে পিরোজপুর পৌরসভার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টও চরম সংকটে পড়েছে। প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি সরবরাহের উপর লক্ষাধিক মানুষ নির্ভরশীল। পানির অভাবে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ও কৃষিজমির চাষাবাদ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, নদীর পানি না থাকায় চাষাবাদে পরিকল্পিত জল সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না, যা ফলন ও জীবিকা উভয়ের জন্য হুমকিস্বরূপ।

পিরোজপুর পৌরসভার পানি ও পয়িষ্কাশন বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, ‘নদীর শুকিয়ে যাওয়ায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে পানি সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। নদীতে পানি না থাকায় প্ল্যান্টে পর্যাপ্ত জল পৌঁছায় না। আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত ব্লক স্থাপন এবং উদাসীনতার কারণে নদীর তীর সংরক্ষণ ও জলপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নদীর এক তৃতীয়াংশ ভরাট হয়ে গেছে, যার ফলে নদী প্রাকৃতিকভাবে মরে যাচ্ছে। পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন জানান, ‘বরাদ্দ পেলে নদী খনন করে চর অপসারণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করা হবে।’ তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এই ব্যবস্থা যথাযথ সময়মতো নেওয়া হয়নি।

নদীর পানি কমে যাওয়ায় শুধু নৌপরিবহন নয়, এলাকার কৃষিজমির সেচেরও গুরুতর প্রভাব পড়েছে। কমপক্ষে ১৫ হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ নদীর প্রাকৃতিক পানির উপর নির্ভরশীল। নদীর নাব্যতা হারানো ও পানি সংকটের কারণে ফসলের উৎপাদন হ্রাস এবং কৃষকের আয় সংকুচিত হচ্ছে।

স্থানীয়রা আরো জানান, নদীর মধ্যবর্তী চরগুলোতে জলাধার ও নদীর খনন ছাড়া যাত্রী ও মালবাহী নৌ চলাচল পুনরায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। নদী পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজন উদ্যোগী প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। নদী পুনঃস্থাপনে না গেলে শুধু নৌপরিবহন নয়, এলাকার কৃষি ও পানির সরবরাহও ক্রমেই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

বলেশ্বর নদী পুনরুজ্জীবন ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি স্থানীয়দের তীব্র আক্ষেপ। নদী জীবিত থাকলে পৌরসভার পানির চাহিদা পূরণ, নৌ চলাচল ও কৃষি কার্যক্রম সহজতর হবে। নদী রক্ষার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ।

বর্তমান পরিস্থিতি যদি না সংশোধন করা হয়, তাহলে বলেশ্বর নদী ধীরে ধীরে মরতে বসেছে। নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষ, কৃষক ও পরিবেশ সক্রিয়দের জন্য তা এক ভয়ঙ্কর সংকটের আভাস দিচ্ছে। নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক না হলে স্থানীয় জীবিকা, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে।

এতে পরিষ্কার, শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে একসময়ের প্রমত্তা নদী আজ নিজস্ব মর্যাদা হারাচ্ছে। নদী পুনরুজ্জীবন ও শহর-পরিষেবা বজায় রাখতে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত