প্রকাশ: ১৮ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু নেতৃত্ব রয়েছে, যারা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকতা নয়, রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাকেও গড়ে তুলেছেন ন্যায়, নীতি এবং মানবিকতা দিয়ে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও অনন্য উদাহরণ হলেন ইসলাম ধর্মের শেষ নবী, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং এক দক্ষ রাষ্ট্রনায়কও ছিলেন, যিনি ধর্ম এবং রাষ্ট্র—এই দুইকে অঙ্গাঙ্গিভাবে সংযুক্ত করে মানবসভ্যতার জন্য এক অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মহানবী (সা.) এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মদীনায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেটি ছিল ইসলামি দর্শনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র। সেখানে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলেও, তা কোনো একক গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং তিনি এক বহুত্ববাদী সমাজে সহাবস্থানের ভিত্তি গড়ে তোলেন, যেখানে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা পারস্পরিক সম্মান এবং চুক্তির ভিত্তিতে সহাবস্থান করত।
মদিনার সনদ বা ‘সাহিফা’ ছিল এই রাষ্ট্রের প্রথম লিখিত সংবিধান, যেখানে মহানবী (সা.) ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং বিচার ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করেন। এই সনদে প্রতিটি গোষ্ঠীকে স্বীয় ধর্ম ও রীতিনীতির ওপর চলার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল সে সময়ের বিশ্বে এক বিপ্লবী চিন্তা। ধর্মীয় সহনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করেই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।
রাসুল (সা.) কোনো সময় ধর্মকে শাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি ছিলেন ন্যায়, সহানুভূতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থার পথপ্রদর্শক। তাঁর শাসনে দুর্বলদের অধিকার সুরক্ষিত ছিল, ধনী-গরিবের মধ্যে ভারসাম্য ছিল, বিচার কার্যক্রমে প্রভাবশালীদের জন্য বিশেষ ছাড় ছিল না। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “তোমাদের আগের জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এজন্য যে, তারা দুর্বলদেরকে শাস্তি দিত, কিন্তু অভিজাতদেরকে ছেড়ে দিত।”
মহানবী (সা.) এর রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ছিল—‘আমানত’ এবং ‘আদালত’। শাসনব্যবস্থা ছিল কল্যাণকামী এবং জনগণের সেবার লক্ষ্যে গঠিত। তিনি কখনো নিজ স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার করেননি। বরং তাঁর জীবন ও কর্মে দেখা যায়, একজন শাসক কীভাবে আত্মসংযম, ন্যায়পরায়ণতা ও পরামর্শমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি জটিল সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন।
মহানবী (সা.) ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চর্চার পাশাপাশি সমাজ গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি কখনো ধর্মকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেননি। কুরআনের ভাষায়—“ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই”—এই মূলনীতিকে সামনে রেখে তিনি সমাজে সচেতনতা, সংলাপ এবং নৈতিকতার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ছিল এমন একটি কাঠামো, যা মানুষের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়ের প্রতিফলন ঘটাবে, কিন্তু কারো বিশ্বাস বা জীবনের ওপর জোর প্রয়োগ করবে না।
আজকের বিশ্ব, যেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে ঘিরে নানা বিভ্রান্তি ও সংঘাত দেখা যায়, সেখানে মহানবী (সা.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি দেখিয়েছেন, ধর্ম ও রাষ্ট্র একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়—বরং ভারসাম্য, সহানুভূতি এবং নৈতিক শাসনের মাধ্যমে তারা একে অপরকে পরিপূরক করে তুলতে পারে।
তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল, প্রজাপ্রীতি এবং ধর্মীয় সহনশীলতা আজও বিশ্বের নেতৃত্বব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবনের শিক্ষা কেবল মুসলমানদের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক উন্নততর সভ্যতার নকশা।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন