শিশুদের মধ্যে বাড়ছে হাম, উদ্বেগে অভিভাবকরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ বৃদ্ধি

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে আবারও শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে, যা অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় চিকিৎসকদের কাছে জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে ফুসকুড়ি নিয়ে আসা শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মৌসুমি বৃদ্ধি হলেও কিছু ক্ষেত্রে তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যদি সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত রুবেওলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন আক্রান্ত শিশু তার আশপাশের অধিকাংশ সংবেদনশীল শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে, যদি তারা আগে টিকা না নিয়ে থাকে।

বর্তমানে চিকিৎসা কেন্দ্রে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে বেশিরভাগ শিশুই জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে শরীরে লালচে ফুসকুড়িও দেখা যাচ্ছে, যা হামের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, সব ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলো হাম ভাইরাসের কারণে নাও হতে পারে। অনেক সময় অন্যান্য ভাইরাস থেকেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়, যাকে ‘পারা মিজলস’ বা হামসদৃশ অসুখ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই হামসদৃশ অসুখের পেছনে রুবেলা, অ্যাডেনোভাইরাস, এন্টারোভাইরাস কিংবা পারভোভাইরাস বি-১৯-এর মতো বিভিন্ন ভাইরাস দায়ী থাকতে পারে। ফলে শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে যে এটি প্রকৃত হাম নাকি অন্য কোনো ভাইরাসজনিত অসুখ। এ কারণে সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, হাম নিজে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি এর পরবর্তী জটিলতাও অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা হলো ‘পোস্ট-মিজলস নিউমোনিয়া’। হামের পর শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে সহজেই ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়ার সৃষ্টি হয়। এটি কখনো সরাসরি ভাইরাসের কারণে, আবার কখনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের মাধ্যমে ঘটে।

চিকিৎসকদের মতে, এই নিউমোনিয়া দুই ধরনের হতে পারে। এক ধরনের ক্ষেত্রে হাম ভাইরাস সরাসরি ফুসফুসকে আক্রান্ত করে, যাকে প্রাইমারি ভাইরাল নিউমোনিয়া বলা হয়। অন্য ক্ষেত্রে, হামের কারণে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটে, যা সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া হিসেবে পরিচিত। এই অবস্থায় স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়ে, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস কিংবা হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ এখানে অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যায়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি। চিকিৎসা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে হাম আক্রান্ত শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তীতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, হাম বিশ্বজুড়ে এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হয় এবং হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটে, যার বড় একটি অংশ নিউমোনিয়ার মতো জটিলতার কারণে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির ঘাটতি বিদ্যমান।

বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে, যা ‘এক্সপ্যান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশন’ বা ইপিআই-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে এমআর ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, যা হাম ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। তবে নানা কারণে এখনো অনেক শিশু এই টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি শিশুর পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে, কারণ অপুষ্ট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে এবং তারা সহজেই সংক্রমণের শিকার হয়। এছাড়া ভিড়পূর্ণ পরিবেশ এড়িয়ে চলা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিশুর জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। একই সঙ্গে নিজ উদ্যোগে ওষুধ সেবন না করে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বাড়াতে পারলে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায় এটি বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।

সর্বোপরি, হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়; বরং এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ, যা সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে শিশুদের এই ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত