প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র দুবাইয়ের সম্পত্তি বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে পরিচিত এই শহর এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবাসন খাত ও সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের বিস্তার ঘটে। এই পরিস্থিতি শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে দুবাই, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের জন্য সুপরিচিত ছিল, সেই ভাবমূর্তি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়েছে দুবাইয়ের আবাসন খাতে। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের নীতি গ্রহণ করছেন, যার ফলে নতুন বিনিয়োগের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চ মাসের প্রথম ১২ দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবাসন খাতে লেনদেন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ কমেছে। শুধু তাই নয়, ফেব্রুয়ারির একই সময়ের তুলনায় এই পতনের হার প্রায় ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
শুধু লেনদেনের পরিমাণ কমেনি, সম্পত্তির দামেও লক্ষণীয় পতন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন আবাসন সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে তাদের সম্পত্তির মূল্য কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাস্তবিকভাবে কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বিক্রেতারা। এই পরিস্থিতি বাজারে চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, কারণ ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন দাম আরও কমার আশায়।
দুবাইয়ের শেয়ারবাজারেও এই সংকটের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ আবাসন কোম্পানির শেয়ারমূল্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৬ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পতন নয়, বরং পুরো খাতের ওপর বিরূপ প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত পাঁচ বছর ধরে দুবাইয়ের আবাসন খাত ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই সময়কালে সম্পত্তির দাম বেড়েছে, নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পর বাজারে একটি স্বাভাবিক সংশোধনের আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। বর্তমান সংঘাত সেই সংশোধন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দুবাইয়ের অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি বড় কারণ ছিল করমুক্ত নীতি এবং বিদেশি নাগরিকদের জন্য সহজ বসবাসের সুযোগ। এই নীতির ফলে ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের ধনী অভিবাসীরা এখানে বিনিয়োগ করেছেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। ফলে আবাসনের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চাহিদা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা অভিবাসীরা সেখানে যেতে অনাগ্রহী হতে পারেন, যা সরাসরি আবাসন বাজারে প্রভাব ফেলবে।
এছাড়া বিনিয়োগকারীদের মানসিকতার পরিবর্তনও এই সংকটকে আরও গভীর করছে। আগে যেখানে দুবাইকে একটি নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের স্থান হিসেবে দেখা হতো, এখন সেখানে অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দুবাইয়ের অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রভাব পড়তে পারে। পর্যটন, বাণিজ্য এবং সেবা খাত, যা দুবাইয়ের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেগুলোও এই অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে আবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, নির্মাণ ও খুচরা ব্যবসা খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কিছু বিশ্লেষক আশাবাদী যে, দুবাইয়ের শক্তিশালী অবকাঠামো, কৌশলগত অবস্থান এবং দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হতে পারে। অতীতেও বিভিন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় দুবাই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর নীতিগত সহায়তা, বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার বার্তা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টাও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দুবাইয়ের আবাসন খাতকে একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বাজারে লেনদেন কমে যাওয়া, সম্পত্তির দাম পতন এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন জটিল। তবে সঠিক নীতি ও কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।