সাবিন অ্যাওয়ার্ডে স্বীকৃতি পেলেন সেঁজুতি সাহা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
সাবিন অ্যাওয়ার্ডে স্বীকৃতি পেলেন সেঁজুতি সাহা

প্রকাশ: ২৫ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব স্বাস্থ্যখাতে টিকা গবেষণা ও উদ্ভাবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ সাবিন অ্যাওয়ার্ডসে সম্মাননা পাচ্ছেন তিন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি সাহা অর্জন করেছেন ‘রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড’, যা নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য অন্যতম সম্মানজনক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। টিকার মাধ্যমে শিশুদের জীবনরক্ষা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী টিকা গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত সাবিন অ্যাওয়ার্ডস দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখা বিজ্ঞানীদের সম্মান জানিয়ে আসছে। এ বছরের পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে আরও রয়েছেন কোভিড-১৯ টিকা উদ্ভাবনের পথিকৃৎ দুই বিজ্ঞানী অধ্যাপক উগুর শাহিন ও অধ্যাপক ওজলেম ত্যুরেজি। তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণা এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর টিকা উদ্ভাবনের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের দেওয়া হচ্ছে ‘অ্যালবার্ট বি. সাবিন গোল্ড মেডেল’।

আগামী ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই তিন বিজ্ঞানীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক তুলে দেওয়া হবে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান সাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করা হবে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক, চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারেন।

বাংলাদেশের বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার স্বীকৃতি দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জিনতত্ত্বভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বিশ্বের বৃহত্তম টাইফয়েড টিকা কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর গবেষণা লাখো শিশুকে মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে চার কোটির বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বৃহৎ কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করেন সেঁজুতি সাহা। তাঁর গবেষণা সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী পরিচালক হিসেবে সেঁজুতি সাহা বাংলাদেশে আধুনিক জিনোম গবেষণার ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা উন্নত গবেষণাগারে হাজার হাজার রোগজীবাণুর জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং নতুন টিকা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করছে। বিশেষ করে ক্লেবসিয়েলা ও আরএসভির মতো রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরির গবেষণায় তাঁর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে।

ড. সেঁজুতি সাহার কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন প্রজন্মের গবেষকদের অনুপ্রাণিত করা এবং দেশে বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা। তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে তিনি একটি টেকসই বৈজ্ঞানিক পরিবেশ তৈরি করতে কাজ করে যাচ্ছেন। গবেষকদের মতে, উন্নত গবেষণার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সেঁজুতি সাহা বলেন, এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশে কাজ করা একটি বড় বৈজ্ঞানিক কমিউনিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকেই উন্নতমানের গবেষণা সম্ভব, যদি গবেষকরা আন্তরিকভাবে সমস্যা সমাধানে কাজ করেন এবং সহযোগিতার মনোভাব বজায় রাখেন।

অন্যদিকে সাবিন গোল্ড মেডেলপ্রাপ্ত দুই বিজ্ঞানী উগুর শাহিন ও ওজলেম ত্যুরেজি কোভিড-১৯ মহামারির সময় নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত কার্যকর টিকা উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা অর্জন করেন। তাঁদের গবেষণা মূলত ক্যানসার চিকিৎসার জন্য তৈরি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে শুরু হলেও মহামারির সময় তাঁরা গবেষণার লক্ষ্য পরিবর্তন করে নতুন টিকা উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকর টিকা তৈরি করে তাঁরা বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

বর্তমানে এই দুই বিজ্ঞানী যক্ষ্মা, এইচআইভি এবং ম্যালেরিয়ার মতো জটিল রোগের বিরুদ্ধে নতুন টিকা তৈরির গবেষণায় কাজ করছেন। পাশাপাশি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে টেকসই টিকা উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের লক্ষ্য হলো আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিকে বিশ্বের সব মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা।

সাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যামি ফিনান বলেন, এই তিন বিজ্ঞানীর কাজ প্রমাণ করে যে গবেষণাগারের উদ্ভাবন কীভাবে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি মনে করেন, টিকা গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা হলে ভবিষ্যতে আরও নতুন রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা উদ্ভাবন মানবজাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। গুটিবসন্ত নির্মূল থেকে শুরু করে পোলিও নিয়ন্ত্রণ—বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা অপরিসীম। কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত টিকা উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া বিজ্ঞানীদের সাফল্য নতুন প্রজন্মকে গবেষণায় উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য খাতে গবেষণা বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে দেশীয়ভাবে নতুন টিকা ও চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সেঁজুতি সাহার অর্জন দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর গবেষণা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের সাবিন অ্যাওয়ার্ডস প্রমাণ করেছে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। ড. সেঁজুতি সাহার মতো গবেষকদের সাফল্য ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত