প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাতক্ষীরার মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এক অননুমেয় পরিবর্তন ঘোষণাই হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসনের নতুন নির্দেশনা। স্থানীয় সময় গত ২৫ মার্চ রাতে সিল ও জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরযুক্ত ‘ফুয়েল কার্ড’ ছাড়া মোটরসাইকেলের জন্য পেট্রল বা ডিজেল তেল সংগ্রহ করা যাবে না — এমন কঠোর ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে। বুধবার রাতে জেলা তথ্য অফিসার মো. জাহারুল ইসলাম এ তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন এবং একই সময় মাইকিংয়ের মাধ্যমে জনগণের কাছে এই নির্দেশনা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নতুন এই নিয়ম অনুসারে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে চালকদের তেল নিতে হবে এবং তৎপর সময়ের বাইরে কোনো ফিলিং স্টেশন বা ডিলার পয়েন্টে জ্বালানি তেল বিক্রয় বা বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফুয়েল কার্ড ছাড়া মোটরসাইকেলের জন্য তেল দেওয়া হবে না — এ কথা পরিষ্কারভাবে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এই কঠোর নির্দেশনা প্রতি মোটরসাইকেল চালক ও মালিকের প্রতিদিনকার যাতায়াত, চাকরি, ব্যবসা–বাণিজ্য ও জরুরি কাজকর্মে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এমন আশঙ্কা করছেন বহু মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সাতক্ষীরা শহর ও উপজেলার বিভিন্ন মহল্লায় মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
একাস্ত্র উদ্বেগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হল, শুধুমাত্র ফুয়েল কার্ড থাকলেই হবে না, তেলের সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও ট্যাক্স টোকেনসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে — নির্দেশনাটি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে।
সাতক্ষীরার মোটরসাইকেল চালকদের অন্যতম দাবি ছিল দীর্ঘদিন ধরে তেলের চাহিদা ও সরবরাহ–বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ, যাতে খোলাবাজারে তেলের লুটপাট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির ঘটনা রোধ করা যায়। কিন্তু এই ফুয়েল কার্ড বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত সকলের মাঝে স্বস্তির সুর তোলে নি। অনেকেই মনে করছেন, বছরের পর বছর ধরে চলমান তেলের মূল্যস্ফীতি ও লাগাতার জ্বালানি সংকটের মধ্যে আরও একটি জটিল ও ভোগান্তিমূলক পদ্ধতি চালু হয়েছে।
স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলোতে গতকাল থেকে সকালের প্রথম দিকে থেকেই দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য দেখা গেছে। বহু চালক বলেন, ‘‘আমরা প্রতিদিন সকাল থেকে কাজের জন্য বের হই। যদি প্রতিবার তেল নিতে ফুয়েল কার্ড নিয়ে সময় খরচ করি, তাহলে কি আমরা সময় মতো কাজ করতে পারব?’’ একজন মোটরসাইকেল মালিক অভিযোগ করেন, ‘‘এভাবে কি আমরা প্রতিদিনের জীবনযাত্রা চালিয়ে নিতে পারব? এটা আমাদের জন্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি করছে।’’
জেলা প্রশাসন জানায়, ফুয়েল কার্ড জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিস, এবং জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া যাবে। প্রতিটি মোটরসাইকেল চালকের জন্য আলাদা–আলাদা ফুয়েল কার্ড ইস্যু করা হবে, যাতে করে শুধুমাত্র ট্রাক, ভ্যান বা মোটরগাড়ি নয়, সাধারণ মোটরসাইকেল পরিবহনকারীও এই অনলাইন ও অফলাইনের মাধ্যমে সরাসরি তেল সংগ্রহ করতে পারেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘‘এটি শুধু একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে মোটরসাইকেলগুলোতে গ্যাসোলিন বা ডিজেল বিক্রি–ক্রয় সঠিকভাবে হবে, খোলাবাজারের অপপ্রচেষ্টা রোধ হবে, এবং একদিকে যেখানে তেলের অনিয়মপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে, সেখানে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’’
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজের একাংশ মনে করেন, এই নতুন বিধান ভোগান্তি ছাড়া কিছুই বয়ে আনবে না। একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘‘আমরা দিনের পর দিন তেলের সংকট ও মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি। এখন ফুয়েল কার্ড নামে আরেকটি ব্যয়বহুল ও সময় খরচ করবে এমন পদ্ধতি চালু হলে সাধারণ মানুষের জীবনের উপর কি পড়বে এর প্রভাব তা আমরা ভবিষ্যতে বুঝতে পারব।’’
ফিলিং স্টেশন মালিক ও কর্মচারীরাও শিরদাঁড়িয়ে আছেন। তারা বলছেন, ‘‘প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়। এমন সময় ফুয়েল কার্ডের মাধ্যমে বিক্রয় করলে আমাদের কাজ ধীরগতির হয়ে যাবে, গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হবে, এবং লাইসেন্স ও অন্যান্য ডকুমেন্ট দেখে তেল দেওয়া হবে — এতে সাধারণ সময় বেশি লাগবে।’’
এই কঠোর নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসন সতর্ক করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ‘‘নির্ধারিত সময়ের বাইরে তেল দেওয়া বা ফুয়েল কার্ড ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ করা কঠোরভাবে নিষেধ। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’
সাতক্ষীরার বিভিন্ন মোটরসাইকেল মালিকরা আবারও নিজেদের নিরাপত্তা, চলাচল ও জীবিকার জন্য আন্দোলনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা দাবি করছেন, ফুয়েল কার্ড ছাড়া যদি তেল নেওয়া না যায়, তাহলে তা কার্যত তাদের স্বাধীন চলাচলের অধিকার হরণ করবে। অনেকে ষড়যন্ত্র মতেও দেখছেন এই নতুন নির্দেশনাকে, যার ফলে তেলের উপরে নির্ভরশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করা হবে।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি এই নির্দেশনার ব্যতিক্রম বা সংশোধনী আসে, সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জনস্বার্থে উন্নত ও কার্যকর সমাধান কেন হবে না তা নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনকেও প্রশ্ন তুলতে দেখা যাবে।
এই নতুন নিয়ম চালুর পরপরই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্রসমাজ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও মতামত প্রকাশ করেছে। অনেকই বলেছেন, ‘‘নীতিগতভাবে তেলের অপপ্রচেষ্টা ও অসামঞ্জস্য নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, কিন্তু তা করতে হলে আগে কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, সিঙ্গেল/ডুয়েল–জ্বালানি নীতির স্থিতিশীলতা ও যান্ত্রিক সার্ভিস পয়েন্টগুলোর উন্নয়ন করতে হবে।’’
ফুয়েল কার্ডের মাধ্যমে মোটরসাইকেল চালকদের তেল নেওয়া হবে — এই ‘নতুন নিয়ম’ সাতক্ষীরার মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই সিদ্ধান্তের পর চলছে নানা বিতর্ক, অসন্তোষ ও প্রশ্ন–উত্তরের দোলাচলে স্থানীয় জনগণের দিন কাটছে।