কর্নেল ওসমানী কীভাবে হলেন মুক্তিবাহিনীর প্রধান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
কর্নেল ওসমানী মুক্তিবাহিনী সেনাপতি

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাস বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অথচ গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালানো হলে বাঙালি জাতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাজনৈতিক সমঝোতার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। সেই উত্তাল সময়েই আবির্ভাব ঘটে এক অনন্য সামরিক নেতৃত্বের, যার নাম কর্নেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে প্রতিরোধ ছিল বিচ্ছিন্ন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সেনা সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে লড়াই শুরু করলেও একটি ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট ছিল। এপ্রিল মাসের শুরুতে সেই বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে সংগঠিত করে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সময়েই সামনে আসেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এমএজি ওসমানী, যিনি পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯১৮ সালে সুনামগঞ্জে জন্ম নেওয়া ওসমানী শৈশব থেকেই শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল ছিলেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ফ্রন্টে তার নেতৃত্বগুণ বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও বাঙালি হওয়ায় তিনি পদোন্নতিতে বঞ্চিত হন। ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদে অবসর নিলেও তার সামরিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা তখনও অমলিন ছিল।

অবসর গ্রহণের পর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছায়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়া এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেশকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যায়। এই আন্দোলনে কর্নেল ওসমানীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত বাঙালি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করতে গোপনে কাজ শুরু করেন।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় ঢাকায় বায়তুল মোকাররম এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের এক সমাবেশে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সেখানে অংশ নেওয়া সেনারা দেশের জন্য প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নেওয়ার শপথ করেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, যুদ্ধের প্রস্তুতি তখন অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল এবং ওসমানী সেই প্রস্তুতির অন্যতম কারিগর ছিলেন।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে সংগঠিত করতে ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে অংশ নেন তৎকালীন সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কেএম সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফসহ আরও অনেক কর্মকর্তা। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে কর্নেল এমএজি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

তেলিয়াপাড়া বৈঠকেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য কৌশল নির্ধারণ করা হয়, যা ‘তেলিয়াপাড়া রণকৌশল’ নামে পরিচিত। দেশকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিকল্পনা মুক্তিযুদ্ধকে একটি সংগঠিত ও কার্যকর রূপ দেয়।

এর কিছুদিন পর ১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। এই সরকার কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়। তার অভিজ্ঞতা, সিনিয়রিটি এবং নেতৃত্বগুণ তাকে এই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তুলেছিল।

সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর ওসমানী মুক্তিবাহিনীকে নিয়মিত ও অনিয়মিত দুই ভাগে বিভক্ত করেন। নিয়মিত বাহিনীতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিতেন। অন্যদিকে, সাধারণ জনগণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয় গণবাহিনী, যারা গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করত। এই দ্বিমুখী কৌশল পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার পরিকল্পনা, কৌশল এবং দৃঢ় নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে একটি সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার পর তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। তবে তার প্রকৃত পরিচয় থেকে যায় একজন সাহসী নেতা হিসেবে, যিনি সংকটের সময়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কর্নেল এমএজি ওসমানীর জীবন ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তার সামরিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দেশপ্রেম মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয়। তিনি শুধু একজন সেনাপতি নন, বরং স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য নায়ক, যার অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত