হরমুজে নিরাপদ করিডর, বাংলাদেশসহ ৬ দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
হরমুজ প্রণালি বাংলাদেশ জাহাজ নিরাপত্তা

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য এসেছে কিছুটা স্বস্তির খবর। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা চরমে, তখন ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশসহ কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশের জাহাজকে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। এই ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য বড় ধরনের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডর। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই প্রণালির ওপর নির্ভর করে বহু দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় এই প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, পুরো প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু নির্দিষ্ট দেশকে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে অথবা বিশেষ কারণে অনুমতি পেয়েছে, তাদের জাহাজগুলোকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার হতে সহায়তা করছে।

এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হওয়ায় তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, বাংলাদেশ তার জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিয়ে থাকে এবং এই আমদানি প্রক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই পথ নিরাপদ না থাকলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত।

ইরানের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক ও ভারতের মতো দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশও এই সুবিধা পাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারতের কয়েকটি জাহাজ নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাস্তবিক অর্থেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে এবং তা কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তবে এই ঘোষণার পাশাপাশি ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সব দেশের জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য নয়। যেসব দেশকে তারা বর্তমান সংঘাতে প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছে, তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত করিডরে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রবেশাধিকার নির্ভর করছে রাজনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। আগে যেখানে আন্তর্জাতিক জলপথগুলো তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ছিল, এখন সেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বাড়ছে। এর ফলে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং যেকোনো সময় নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস, সরবরাহ চেইন বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে এই ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানেরও একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিই এই ধরনের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন, শিল্প এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে। তাই হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের এই সুযোগ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্বস্তির বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এই স্বস্তি যে স্থায়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি এখনও অস্থির, এবং যেকোনো সময় তা নতুন মোড় নিতে পারে। ফলে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা এখন সময়ের দাবি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা একটি তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন। এটি যেমন তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তি এনে দিচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণে নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত