প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে আবারও রক্তাক্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জেলার পানছড়ি উপজেলায় গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের স্থানীয় এক নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে এলাকায়। নিহত নীতিদত্ত চাকমা ওই সংগঠনের পানছড়ি উপজেলা সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পানছড়ি সদর ইউনিয়নের সূতকর্মা পাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালবেলার শান্ত পরিবেশ হঠাৎ করেই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন নীতিদত্ত চাকমা।
ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালের পথে কিংবা হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কায় কিসলু জানান, হাসপাতালে আনার আগেই নীতিদত্ত চাকমার মৃত্যু ঘটে এবং বর্তমানে তার মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে তখন পর্যন্ত হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তিনি জানান, ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে।
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও আলোচনায় এসেছে। গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ অভিযোগ করেছে, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ এই হামলার সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দুই সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা বিরাজ করছে, যার ধারাবাহিকতায় এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এই ঘটনা তাদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং এটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এই বিরোধ মাঝে মাঝে সহিংস রূপ নেয়, যার ফলে সাধারণ মানুষও আতঙ্কে বসবাস করতে বাধ্য হন। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলে এ ধরনের সংঘাত নতুন কিছু নয়। তবে প্রতিটি নতুন ঘটনার পরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়ে যায়।
নীতিদত্ত চাকমা স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন সংগঠক ছিলেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনও সহিংসতার চক্র থেকে পুরোপুরি বের হওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সংলাপ, আস্থার পরিবেশ তৈরি এবং স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের বিরোধ ও অবিশ্বাস দূর না হলে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে।
এই হত্যাকাণ্ড আবারও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ফলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
নীতিদত্ত চাকমার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি বেদনাদায়ক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফেরাতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা।