রাজশাহীতে পেঁয়াজের দরপতনে চাষির কান্না

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২৯ বার
রাজশাহীতে পেঁয়াজের কেজি ৫ টাকা

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীর মাঠজুড়ে এখন পেঁয়াজের সোনালি প্রাচুর্য, কিন্তু সেই প্রাচুর্যই যেন হয়ে উঠেছে কৃষকের দুঃস্বপ্ন। যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগেও পেঁয়াজ বিক্রি করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিলেন চাষিরা, সেখানে এখন তারা বাধ্য হচ্ছেন উৎপাদন খরচের বহু নিচে দামেই পণ্য বিক্রি করতে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় রাজশাহীর বিভিন্ন মোকাম ও হাটবাজারে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে।

শুক্রবার রাজশাহীর বিভিন্ন হাটে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। এই হিসাবে কৃষকের হাতে কেজি প্রতি দাম উঠছে মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে একই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজিতে। এই বিশাল ব্যবধান কৃষকদের মনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

চাষিরা বলছেন, দুই সপ্তাহ আগেও তারা প্রতি মণ পেঁয়াজ ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বাজারে এমন দরপতন তাদের পুরো হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দিয়েছে। রাজশাহীর বাগমারার চাষি আফসার আলী জানান, তার দীর্ঘ ১৫ বছরের কৃষি জীবনে এমন কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়নি কখনো। তার ভাষায়, “এটা আমাদের জন্য শুধু ক্ষতি না, একেবারে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা।”

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকট। পরিবহন খাতে জ্বালানির ঘাটতির কারণে চালান কার্যত ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারেই জমে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ। দালাল ও ফড়িয়ারা বড় বাজারে পণ্য পাঠাতে না পারায় তারা কম দামে পণ্য কিনতে আগ্রহী নয়। এতে করে চাষিরা বাধ্য হচ্ছেন যেকোনো দামে পণ্য বিক্রি করতে।

চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। পরিবহন ও খাজনা খরচ বাদ দিলে তাদের হাতে থাকছে মাত্র ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণে ৫০০ টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই অবস্থাকে কৃষকেরা এক কথায় ‘অসহনীয়’ বলে উল্লেখ করছেন।

রাজশাহীর বাগমারার সোনাডাঙ্গা গ্রামের চাষি সুজন কুমার জানান, তিনি এবছর ৬ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলেও এখন বাজারদর দেখে তিনি হতাশ। বাড়ির আঙিনায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রেখেছেন, কিন্তু ক্রেতা পাচ্ছেন না।

এদিকে মাঠে পেঁয়াজ উত্তোলনের মৌসুম পুরোদমে চলছে। ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কায় কৃষকেরা অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে দ্রুত পেঁয়াজ তুলছেন। ফলে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আসছে, যা দাম আরও কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক চাষি কম দামে বিক্রি না করে পেঁয়াজ বাড়িতে মজুত রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে সেগুলো পচে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সেই সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে।

কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য হওয়ায় ভরা মৌসুমে দাম কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে এ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে মজুত করে রাখে এবং পরে সরবরাহ কমে গেলে বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করে।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষিপণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে এবং পরিবহন খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতি শুধু রাজশাহী নয়, দেশের উত্তরাঞ্চলের আরও কয়েকটি জেলায় একইভাবে প্রভাব ফেলেছে। কৃষকেরা বলছেন, যদি দ্রুত পরিবহন সমস্যা সমাধান না করা হয়, তাহলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি হস্তক্ষেপও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

রাজশাহীর পেঁয়াজচাষিদের বর্তমান বাস্তবতা যেন এক কঠিন বৈপরীত্যের গল্প। একদিকে মাঠে ফলনের প্রাচুর্য, অন্যদিকে বাজারে সেই পণ্যের মূল্যহীনতা। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ফসল যখন ন্যায্য মূল্য পায় না, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং মানসিক ভাঙনেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে কৃষকেরা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য প্রতিদান পেতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত