জ্বালানি সংকটে বিমান ভাড়া বাড়ছে, বিপাকে খাত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬
  • ১১ বার
জেট ফুয়েল দাম বৃদ্ধি বিমান ভাড়া

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পেও। জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে দেশের বিমান চলাচল খাত এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এটি বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে জেট ফুয়েলের ওপর। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে লিটারপ্রতি জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে ১০৭ টাকা, যা এভিয়েশন খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে যাত্রী ভাড়ার ওপর। দেশের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে একক যাত্রায় ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট এবং সৈয়দপুর রুটে ভাড়ার এই বৃদ্ধি যাত্রীদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে যশোর ও রাজশাহী রুটেও ভাড়া বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। রিটার্ন টিকিটের ক্ষেত্রে যাত্রীদের দ্বিগুণ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ভ্রমণকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে।

শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক রুটেও ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এয়ারলাইন্সগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অপারেশনাল খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ভাড়াও শিগগিরই বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কম লাভজনক রুটগুলোতে ফ্লাইট সংখ্যা কমানো বা বন্ধ করার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।

এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের মূল্য আঞ্চলিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল মফিজুর রহমান বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যেখানে জেট ফুয়েলের দাম তুলনামূলক কম, সেখানে বাংলাদেশে এর দাম অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেট ফুয়েলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এতে করে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো তুলনামূলক কম খরচে পরিচালনা করতে পারলেও দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো উচ্চ ব্যয়ের কারণে পিছিয়ে পড়ছে।

এদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের গড় দর, ডলার বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় রেখেই জেট ফুয়েলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য ছিল। তবে এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তারা বলছেন, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই এবং সাম্প্রতিক সময়ে পর্যাপ্ত তেল আমদানি করা হয়েছে। ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এভিয়েশন খাতের অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়। ফলে জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে সরাসরি অপারেশনাল খরচ বেড়ে যায়। এতে করে এয়ারলাইন্সগুলো বাধ্য হয়ে ভাড়া বাড়াতে বা ব্যয় কমানোর জন্য রুট সংকোচনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

দেশের অন্যতম বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স-এর জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে খরচ নিয়ন্ত্রণ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প পথ খুব একটা খোলা নেই বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।

এই সংকটের প্রভাব শুধু এয়ারলাইন্স বা যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিমান ভাড়া বৃদ্ধি পেলে পর্যটন খাত, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ পর্যটন নির্ভর এলাকাগুলোতে যাত্রী কমে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, ভাড়া বৃদ্ধির কারণে যাত্রী সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক যাত্রীই বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য আরও আর্থিক চাপ তৈরি করবে। ফলে একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে আয় কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—এই দ্বৈত সংকটে পড়েছে দেশের এভিয়েশন শিল্প।

এ অবস্থায় দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাস্তবসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ না করলে দেশের এভিয়েশন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব যে বাংলাদেশের মতো দেশেও সরাসরি অনুভূত হচ্ছে, তার একটি বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই জেট ফুয়েল সংকট। এর ফলে শুধু বিমান ভাড়াই নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের পরিবহন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত