প্রকাশঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে, যদিও সরকারি বক্তব্যে এর কোনো সুস্পষ্ট স্বীকৃতি নেই। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে এক ভিন্ন গল্প—তেল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, বন্ধ হয়ে যাওয়া অসংখ্য পাম্প, স্থবির নৌপথ এবং শিল্প উৎপাদনে ধাক্কা। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং কাস্টমস বিভাগের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য, যা সংকটের গভীরতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। কাঁচামালের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে নতুন কোনো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চালান আসেনি। ফলে মার্চের মাঝামাঝি থেকেই উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমান মজুত দিয়ে সর্বোচ্চ এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এরপর নতুন কাঁচামাল না এলে রিফাইনারি বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধাবস্থার কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ফলে বাংলাদেশসহ অনেক আমদানিনির্ভর দেশই সরবরাহ সংকটে পড়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা অনুযায়ী মাসে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির পর থেকে কোনো নতুন চালান না আসায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০ টন ক্রুড পরিশোধন সম্ভব হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। এতে করে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের পরিমাণও ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং সংকটের মূল কারণ ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-এর কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় প্রায় একই পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এবং কাস্টমসের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
কাস্টমসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। মার্চ মাসের প্রথম ২৩ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬৫ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল কম আমদানি হয়েছে। এই ঘাটতি কীভাবে পূরণ হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
এই তথ্যগত অসামঞ্জস্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ ও আমদানির তথ্য যদি পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সংকট মোকাবিলার কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। বরং এতে করে বিভ্রান্তি বাড়ে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যও সংকটের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। গত দেড় মাসে একাধিক জ্বালানিবাহী জাহাজ বন্দরে এলেও তার অধিকাংশই ছিল গ্যাসজাতীয় জ্বালানি বহনকারী। তরল জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ফলে বাজারে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দেশের অর্ধেকের বেশি তেল পাম্পে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো খোলা রয়েছে, সেগুলোর সামনে দিন-রাত লম্বা যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে চালকদের। এতে করে পরিবহন খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
নৌপথের পরিস্থিতি আরও করুণ। ডিজেলের অভাবে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে লাইটার জাহাজসহ অভ্যন্তরীণ নৌযান চলাচল। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য যে লাইটার জাহাজগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই এখন অচল হয়ে পড়েছে। ফলে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিদ্যুৎ খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা পৌঁছাতে না পারায় উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা, বোতলে তেল বিক্রি বন্ধ করা এবং যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই করে তেল সরবরাহের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব উদ্যোগ খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। বিপুল চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এতটাই কম যে এসব ব্যবস্থা সংকট সামাল দিতে পারছে না।
এদিকে জ্বালানি খাতে কালোবাজারি ও অনিয়মের অভিযোগও বাড়ছে। অনেক জায়গায় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সাধারণ মানুষ আরও বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে এক জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি বক্তব্য, বিপিসির তথ্য এবং কাস্টমসের পরিসংখ্যানের মধ্যে যে ফারাক দেখা যাচ্ছে, তা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংকট স্বীকার করে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতে যে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক দিক থেকেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখন প্রয়োজন বাস্তবতা স্বীকার করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, যাতে করে দেশের জ্বালানি খাত আবার স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।