প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই আবারও ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। শনিবার (৪ এপ্রিল) ভোরে ইসরাইলের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। হামলায় ভবন ধসে পড়া, শিল্পাঞ্চলে আগুন লাগা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার কিছুতে ক্লাস্টার ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই ধরনের অস্ত্র একসঙ্গে বহু বিস্ফোরক উপাদান ছড়িয়ে দেয়, ফলে বড় এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।
ইসরাইলের কেন্দ্রীয় শহর রামাত গানে একটি ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে। একই সময়ে রোশ হাইয়িন এলাকায় একটি উচ্চ-ভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইনে আঘাত লাগায় শহরের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে বহু পরিবার অন্ধকারে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছে।
ইসরাইলের জরুরি সেবা সংস্থার বরাতে জানা গেছে, বনি ব্রাক শহরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের পর ভাঙা কাঁচের আঘাতে অন্তত একজন আহত হয়েছেন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পেতাহ তিকভা ও তেল আবিবের আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ভবনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
দক্ষিণাঞ্চলের নেগেভ মরুভূমির নিকটবর্তী নিওত হোভাভ শিল্পাঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরে দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। প্রাথমিকভাবে বড় ধরনের রাসায়নিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার সময় একাধিক এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে এবং সাধারণ মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে আকাশেই ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে আকাশে প্রতিরোধের সময় বিস্ফোরণের ফলে ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন এলাকায় পড়ে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই হামলাকে বড় ধরনের উত্তেজনাকর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার প্রবণতা বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইতোমধ্যে বহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ক্লাস্টার বোমা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত বিতর্কিত অস্ত্র। কারণ এগুলো বিস্তৃত এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বেসামরিক মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করলে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও বিস্ফোরক অবশিষ্টাংশ বিপজ্জনক হয়ে থাকতে পারে।
এই হামলার ঘটনায় ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এলাকা এবং উদ্ধার কার্যক্রমের দৃশ্য দেখা গেছে। অনেক পরিবার রাতভর নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। একদিকে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল বলছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মানবিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে। বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত উত্তেজনা কমানো জরুরি বলে মত প্রকাশ করেছেন তারা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে এবং জরুরি পরিষেবাগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হামলার আশঙ্কা থাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের প্রতিটি নতুন হামলা বিশ্ববাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামরিক শক্তির প্রদর্শনের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।