প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আশ্বস্ত করার মতো তথ্য দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে প্রায় তিন মাসের পেট্রোল ও অকটেনের মজুত রয়েছে, যা বিদ্যমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট। একই সঙ্গে আগামী তিন মাসের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে নতুন করে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রোববার সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চলতি এপ্রিল মাসের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণে কোনো ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নেই। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নতুন আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার কেবল বর্তমান চাহিদা মেটানোর দিকেই নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার দিকেও নজর দিচ্ছে। এজন্য জ্বালানি তেলের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা স্যাংশন সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন এ বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সম্প্রতি মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার আশাবাদী, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছাড়পত্র বা ‘স্যাংশন ওয়েভার’ পাওয়া গেলে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির সুযোগ পেলে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার ঠেকাতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় চার লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
কৃষি খাতের জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও আশ্বস্ত করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের যাতে সেচ ও অন্যান্য কাজে জ্বালানি পেতে কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো এলাকায় জ্বালানি সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বল্পমেয়াদে মজুত বাড়ানো এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য তা কিছুটা হলেও কমাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবহন খাত এবং কৃষি খাতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, তিন মাসের জ্বালানি মজুত থাকার ঘোষণা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সতর্কতা অবলম্বন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণই হবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।