প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা চার দফা মূল্যবৃদ্ধির পর অবশেষে দেশের স্বর্ণবাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বগতির ধারা ভেঙে স্বর্ণের দামে লক্ষণীয় পতন ঘটিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম কমেছে ২ হাজার ১৫৮ টাকা, যা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবার মধ্যেই কিছুটা ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
সোমবার সকালে বাজুস এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানায় এবং একই দিন সকাল ১০টা থেকে নতুন দর কার্যকর করা হয়। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণ এখন বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৮১৯ টাকায়। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এই হ্রাসকে বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম কমে যাওয়াই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বিবেচনায় এনে নতুন এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে শুধু স্বর্ণ নয়, সামগ্রিক গহনা বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬২১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের ক্ষেত্রে প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ১ হাজার ১৪৬ টাকায়। আর সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ভরি ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮২১ টাকা। প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই আগের তুলনায় দাম কমেছে, যা ক্রেতাদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির বার্তা বহন করছে।
এর আগে সর্বশেষ ১ এপ্রিল স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, তখন ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৭ টাকায় উন্নীত করা হয়। একই সময়ে ২১ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ ২ লাখ ২ হাজার ৮৯৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৯ টাকা। সেই তুলনায় বর্তমান মূল্য কমায় বাজারে একটি ভারসাম্য ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও একই ধরনের সমন্বয় আনা হয়েছে। এবার প্রতি ভরি রুপার দাম ১৭৫ টাকা কমানো হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী ২২ ক্যারেটের রুপার দাম দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৪০ টাকা। ২১ ক্যারেটের রুপা প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৩০৭ টাকায়, ১৮ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ৫৪৯ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৩ হাজার ৩৮৩ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার, এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব স্থানীয় বাজারে সরাসরি পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা যাওয়ায় তার প্রতিফলন দেশের বাজারেও পড়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়াও মূল্য হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বর্ণ সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হলেও দাম বেশি হলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়, ফলে দাম বাড়লে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান মূল্য হ্রাস কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিতে পারে।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, এই মূল্য হ্রাস দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেই দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়কেই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম কমার ফলে বাজারে লেনদেন কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ক্রেতাই কেনাকাটা স্থগিত রেখেছিলেন। এখন তারা আবার বাজারমুখী হতে পারেন, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, স্বর্ণ ও রুপার দামে এই সাম্প্রতিক হ্রাস দেশের বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এটি স্থায়ী প্রবণতা কিনা তা সময়ই বলে দেবে, তবে আপাতত ক্রেতাদের জন্য এটি একটি স্বস্তির খবর। বাজারের এই পরিবর্তন অর্থনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন বিনিয়োগের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের ভূমিকা বিবেচনা করা হয়।