হরমুজে নতুন বাস্তবতা, টোলে তুলবে যুদ্ধের ক্ষতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
হরমুজ প্রণালি নতুন বাস্তবতা

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে ইরান। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সাম্প্রতিক ঘোষণায় দেশটি জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে আর কখনোই ফিরে যাবে না এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বরং নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে অঞ্চলটি, যেখানে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম এই রুটে আর্থিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় তেহরান।

সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে ইরানি নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে ইরানের যে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা এখন থেকে এই প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ট্রানজিট ফি বা টোল আদায়ের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়া হবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে স্পষ্ট, তারা শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই, বরং সক্রিয়ভাবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে চায়। Islamic Revolutionary Guard Corps এক ঘোষণায় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের যুগ শেষ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল-এর মতো দেশগুলোর জন্য এই জলপথে চলাচলের নিয়ম স্থায়ীভাবে বদলে যাচ্ছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ উপদেষ্টা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ মেহদি তাবাতাবাঈ বলেছেন, কোনো ধরনের হুমকি বা আল্টিমেটাম দিয়ে তেহরানকে নত করা যাবে না। তার ভাষায়, যুদ্ধের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না। বর্তমানে কিছু নির্বাচিত বিদেশি জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও, তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ট্রানজিট ফি আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনা। ইরান পারস্য উপসাগরে একটি ‘নিউ অর্ডার’ বা নতুন নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নৌবাহিনী। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো বহিরাগত শক্তির ভূমিকা থাকবে না। ইতোমধ্যে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা সীমাবদ্ধতা সরাসরি প্রভাব ফেলে আন্তর্জাতিক বাজারে। ইতোমধ্যেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার প্রভাব পড়ছে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারেও। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে এই পরিস্থিতিতে চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অবস্থান কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তাও বহন করে। এটি একদিকে যেমন পশ্চিমা শক্তির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের জোট ও নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই নতুন ব্যবস্থাকে যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি তাদের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সবশেষে, ইরান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করবে না। দেশটি মনে করছে, এই নতুন বাস্তবতা তাদের জন্য কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। তবে এই অবস্থান কতটা স্থিতিশীলতা আনবে, আর কতটা নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে—তা নির্ভর করছে আগামি দিনগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত