সরকারের দাবির বিপরীতে বাস্তবতা: শফিকুর রহমান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
ডা. শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সরকারের বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বক্তব্য শুনলে মনে হয় বাংলাদেশ যেন তেলের ওপর ভাসছে, অথচ সাধারণ মানুষের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-র ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের একটি সমৃদ্ধ চিত্র তুলে ধরা হয়, যেখানে মনে হয় দেশে যেন ‘সোনার নহর’ বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দল যখন জ্বালানি সংকট বা জনদুর্ভোগের বিষয়টি সংসদে তুলতে চায়, তখন তা আলোচনার সুযোগ পায় না। এতে করে জনগণের প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মোটরসাইকেল চালক থেকে শুরু করে গণপরিবহন চালকরাও জ্বালানি সংগ্রহে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অথচ সরকার দাবি করছে, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এই বৈপরীত্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কৃষি খাতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের কৃষকরা এখন সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। ফসল উৎপাদনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানি সংকট দেখা দিলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অশনিসংকেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, খোলা বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি না করে কার্ডের মাধ্যমে বিতরণের যে পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য আরও জটিলতা সৃষ্টি করছে। অনেক কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ এই কার্ড সংগ্রহ করতে না পেরে বিপাকে পড়ছেন। ফলে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং জীবিকা নির্বাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষা খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার অজুহাতে যদি আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত ক্ষতিকর। তিনি করোনাকালীন সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তখন দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং অনেকে ঝরে গিয়েছিল। আবার যদি একই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনগণের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে দেশে নতুন করে স্বৈরাচারী প্রবণতা ফিরে আসছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ধরনের পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তার বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকাও উঠে আসে। তিনি বলেন, দেশের তরুণরা এখন অনেক বেশি সচেতন এবং তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত। অতীতে বিভিন্ন আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই প্রজন্ম যদি জেগে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ সময় আন্দোলনের প্রয়োজন হয় না; তাদের দৃঢ় অবস্থানই পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলের এই ধরনের বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়াতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বিরোধী দলের সমালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাতে কিছু চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দলের এই সমালোচনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জ্বালানি সংকট, কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক সমঝোতাই হতে পারে উত্তরণের পথ—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত