তিন অধ্যাদেশ বাতিলে সংসদে বিল উত্থাপন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২১ বার
অন্তর্বর্তী সরকারের তিন অধ্যাদেশ বাতিলে বিল

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের লক্ষ্যে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘিরে প্রণীত অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে নতুন করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে বিল উত্থাপনের দিন সংসদে কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা আলোচনায় উঠে এসেছে এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সোমবার জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আলাদাভাবে তিনটি বিল উত্থাপন করেন। এসব বিলের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনরায় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদ সূত্রে জানা গেছে, এই বিলগুলো নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বিল উত্থাপনের সময় সংসদে একাধিকবার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংসদের কার্যসূচি অনুযায়ী যে বিলটি উত্থাপন করার কথা ছিল, আইনমন্ত্রী সেটি উপস্থাপন না করে অন্য একটি বিল উপস্থাপন করেন। এতে করে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। সংসদ কক্ষে তখন কিছুটা কানাঘুষা শুরু হয় এবং বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাখ্যা দিতে হয় আইনমন্ত্রীকে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন একই বিল একাধিকবার উত্থাপন করা হয়। সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী একটি বিল প্রথমে পেশ করা হয় এবং পরে তা পাসের জন্য উত্থাপন করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পেশ ও পাসের বিষয়টি একত্রে মিশে যাওয়ায় কার্যপ্রণালিতে ব্যত্যয় ঘটে। এক পর্যায়ে আইনমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেন যে একটি ভুল হয়েছে এবং একটি বিল কার্যসূচি থেকে বাদ পড়ে গেছে।

এই বিভ্রান্তির ফলে সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিলটি কার্যত উত্থাপনই করা সম্ভব হয়নি, যদিও স্পিকার একাধিকবার তা উত্থাপনের আহ্বান জানান। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিলটি একাধিকবার উত্থাপন করা হয়, যা সংসদীয় ইতিহাসে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে, সংসদে একই দিনে আরও সাতটি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে করা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন, ভোটার তালিকা সংশোধনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব বিলের ওপর কোনো আলোচনা ছাড়াই সরাসরি কণ্ঠভোটে পাস করা হয়েছে। বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশগুলো হুবহু অনুমোদনের ভিত্তিতেই এই বিলগুলো পাস করা হয়।

সংসদে বিল পাসের সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও কিছু আপত্তি তোলা হয়। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন বিলের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের হাতে যথাসময়ে বিলের কপি না পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জামায়াতে ইসলামীর এক সংসদ সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে বলেন, তিন দিন আগে বিলের কপি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। এ বিষয়ে স্পিকার বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে তার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস করতে হবে, যার কারণে সময়ের সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, কার্যউপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজন হলে সংসদের অধিবেশন সকাল-বিকাল দুই বেলাতেই চলবে এবং প্রয়োজনে শুক্রবারও অধিবেশন বসতে পারে।

অন্যদিকে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল–২০২৬ নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়েছে। এই বিলে তিন ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আগে অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কৃষিজমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ভূমির জোনিং নির্ধারণ এবং কৃষিভূমি সুরক্ষায় কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া কৃষিজমি অন্য কাজে ব্যবহার, জলাধার ভরাট, পাহাড় কাটা বা প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। পাশাপাশি, জাতীয় প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে কৃষিজমি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে তা নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে হতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ যেমন প্রশংসনীয়, অন্যদিকে কার্যপ্রণালিতে এমন বিভ্রান্তি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরাসরি জনগণের আস্থার সঙ্গে জড়িত।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল এবং নতুন আইন প্রণয়নের এই উদ্যোগ দেশের আইন কাঠামোকে আরও সুসংগঠিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব বিল নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা এবং বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ করা হলে তা আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন ও পাসের এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ যেমন আইন প্রণয়নের গুরুত্বকে সামনে এনেছে, তেমনি সংসদীয় কার্যক্রমের সঠিক প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করেছে। আগামী অধিবেশনগুলোতে এই বিলগুলো নিয়ে কী ধরনের আলোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত