সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি, চাপে নগরজীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে হঠাৎ করেই সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে, যা নগর জীবনে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীর কুড়াতলী ও ঢালী এলাকার বাজার ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেগুন, ঢেড়স, করলা, বরবটি, শসা এবং কাঁচা মরিচসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। কিছুদিন আগেও যে বেগুন ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, তা এখন ৭০ টাকায় পৌঁছেছে। গোল বেগুনের দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৭০ টাকা। ঢেড়সের দাম ৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়। কাঁচা মরিচ, যা রান্নাঘরের অপরিহার্য উপকরণ, তার দামও বেড়ে ১৪০ টাকা কেজিতে পৌঁছেছে। করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৭০ টাকা।

তবে সব পণ্যের দাম বাড়েনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। টমেটো এখন তুলনামূলক সস্তা, ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু ২০ টাকা কেজিতে এবং পেঁয়াজ ৪০ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। তবুও সামগ্রিকভাবে বাজারের চিত্র সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।

সবজির পাশাপাশি মাছ ও মাংসের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালী মুরগির দামও ৩২০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪০ টাকায়। মাছের বাজারেও একই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। রুই মাছ, তেলাপিয়া এবং চিংড়ির দাম গড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের চাপ পড়ছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা একাধিক বিষয়কে দায়ী করছেন। সাম্প্রতিক বৃষ্টি, পরিবহণ ব্যয়ের বৃদ্ধি, সরবরাহে ঘাটতি এবং মৌসুমি সবজির শেষ সময়—এই সব মিলিয়েই বাজারে দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এখন বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে, ফলে দাম বাড়াটা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে, যা সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।

কুড়াতলীর বাজারে কেনাকাটা করতে আসা নয়ন নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, “গত সপ্তাহে যে সবজি ৬০-৭০ টাকায় কিনেছি, এখন সেই একই সবজি ৯০-১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এটি খুবই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।”

একই বাজারে গার্মেন্টস শ্রমিক রুদ্রের কণ্ঠে ছিল হতাশার সুর। তিনি বলেন, “বাজারে এসে দাম শুনলে দম বন্ধ হয়ে আসে। এইভাবে চলতে থাকলে শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”

আরেক ক্রেতা রবিন বলেন, সবজির এই চড়া দাম সাধারণ মানুষের জন্য একপ্রকার দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিদিনের বাজার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নিজেরাও চাপে আছেন। শাজাহান নামে এক সবজি বিক্রেতা বলেন, “আমরা বেশি দামে কিনছি, তাই কম দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। সরবরাহ কম থাকলে দাম বাড়বেই। তবে নতুন সবজি বাজারে এলে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।”

পাইকারি ব্যবসায়ী সজীব হোসেন জানান, পরিবহণ ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আগে যেখানে এক বস্তা পণ্য পরিবহণে কম খরচ হতো, এখন সেখানে ১২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় খুচরা বাজারে গিয়ে দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণত মৌসুমি এবং সরবরাহ নির্ভর। তবে যদি দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ সংকট ও পরিবহণ ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। তারা মনে করেন, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে আনার জন্য পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা জরুরি।

এদিকে, ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির ফলে শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তাদের দৈনন্দিন খরচের হিসাব বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে শুধু সরবরাহ বাড়ানোই নয়, পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহণ খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার করা হলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে, রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবজির দামের এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জন্য এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, নতুন মৌসুমের সবজি বাজারে আসতে শুরু করলে দাম কিছুটা কমবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির কোনো লক্ষণ নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত